চট্টগ্রাম নগরের রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় (সিইপিজেড) অবস্থিত তিনটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় কারখানার অন্তত১২ জন নারী পুরুষ শ্রমিক আহত হয়েছেন।
শনিবার (১১ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, যা চলে প্রায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত। সংঘর্ষের পর কারখানা তিনটি আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আহত ১২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাতজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন, মহিবুল (২৬), ফরিদা (৪০), ইলিয়াস (৩৪), বিদ্যুৎ (৩০), শিউলি (২৪), চঞ্চল (২৮) ও মনোয়ারা (৩৩)।
পুলিশ ও কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাৎসরিক ৯ শতাংশ বেতন বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে বেশ কয়েকদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন সিইপিজেডের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। তাদের আন্দোলনের মুখে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ দাবি মেনে নেন। দেখাদেখি একই দাবিতে অন্য কারখানাগুলোর শ্রমিকরাও আন্দোলন শুরু করে।
বুধবার মেরিমকো পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বেতনভাতা বৃদ্ধি সহ নানা দাবিতে বিক্ষোভ করে। তারা ইপিজেড এলাকার একটি ফটক আটকে দেন। একই সড়কে জেএমএস লিমিটেড নামের আরেকটি কারখানা রয়েছে। ফটক বন্ধ করে দেওয়ার পর গত বুধবার জেএমএস শ্রমিকরা বের হতে না পেরে মেরিমকো শ্রমিকদের কথা-কাটাকাটিতে জড়িয়ে যান।
এরই জেরে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুই কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এ সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১২ জন নারী পুরুষ শ্রমিক আহত হন। পরে সেনাবাহিনী ও শিল্পাঞ্চল পুলিশ সহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। আর আহত ব্যক্তিদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কারখানাগুলো তিনদিন করে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় কারখানার শ্রমিকরা একে অন্যের উপর দোষ চাপান।
মেরিমকো লিমিটডের সুইং সেকশনের অপারেটর মহিবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুধবার আমরা আমাদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে কারখানার সামনে শান্তিপূর্ন আন্দোলন করি। এসময় আমাদের দেখাদেখি জেএমএসের শ্রমিকরাও তাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করে। সেসময় তারা ইপিজেডের মেইন গেইট বন্ধ করে দেয়। আমাদের মালিক পক্ষ আমাদের আংশিক দাবি মেনে নেওয়ায় আমরা আন্দোলন বন্ধ করি এবং আমাদের কারখানা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেসময় আমাদের লোকজন কম থাকায় আমাদের উপর অতর্কিত হামলা করে তারা। একই কায়দায় আজ সকালে যখন আমরা আমাদের কারখানায় কাজের জন্য আসি এর কিছুক্ষণ পরেই জেএমএস এর শ্রমিকরা আমাদের কারখানা ঘেরাও করে আমাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। আমাদের নারী শ্রমিকদের রক্ষা করতে আমরা এগিয়ে আসলে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয়।
মডেস্টের আয়রন অপারেটর হারুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুধবার ইপেজেডের অনেক প্রতিষ্ঠান বেতন বৃদ্ধি, ওভার টাইম রেট বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে আন্দোলন করে। সেখানে আমরাও (জেএমএস ও মডেস্ট) আমাদের প্রতিষ্ঠানের সামনে আন্দোলন করি। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠান আমাদের দাবি দাওয়া মেনে নেওয়ায় আমরা কাজে যোগদান করি এবং কাজ শেষে বাসায় ফিরে যাওয়ার পথে মেরিমকোর শ্রমিকরা আমাদের শ্রমিকদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। এতে আমাদের একশর বেশি শ্রমিক আহত হয়েছে।
তিনি বলেন, আজ সকালে আমরা যখন কাজে যোগ দিই তারা বিনা কারণে আমাদের ওপর হামলা করে। তাদের নারী শ্রমিকরা কারখানার ছাদের উপর থেকে বড় বড় ইট নিক্ষেপ করে। তাদের পুরুষ শ্রমিকরা লোহার পাইপ দিয়ে আমাদের শ্রমিকদের আহত করে।
এ ঘটনার বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে শিল্প পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বুধবার থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নানা ধরনের দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান মালিক তাদের দাবি মেনে নিলেও উভয় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা নিজেরা মারামারিতে জড়ায়। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
এদিকে আহত ব্যক্তিদের বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল সবুজ বলেন, সিইপিজেড থেকে আহত অবস্থায় ১০ থেকে ১২ জনকে আনা হয়েছে। তবে কারও অবস্থা গুরুতর নয়।
ইপিজেড থানার পরিদর্শক (অভিযান) আফসার উদ্দিন বলেন, ঘটনার পর জেএমএস আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মেরিমকো লিমিটেডকেও বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।