পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, দ্রুত নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে কাজ করছে সরকার। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। বছরব্যাপী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের নিয়ে অনুষ্ঠেয় ‘ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশ’ শীর্ষক ‘ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স সিরিজ-২০২৫’ উদ্বোধনী ও ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর নন রেসিডেন্স বাংলাদেশি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এত রাজনৈতিক দলের শাখা নেই, যত বাংলাদেশি শাখা রয়েছে বিদেশে এসব বাঙালিদের ইমেজ নষ্ট করে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষে মিছিল-স্লোগান কিংবা ডিম ছোড়ার মতো ঘটনা দেশের ব্র্যান্ডিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’
তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এ রকম কী পৃথিবীর কোনো দেশের ক্ষেত্রে আপনারা দেখেছেন? কেউ একজন দেশ থেকে যায় আর তাকে ডিম ছোড়ার জন্য বা তার বিরুদ্ধে সেøাগান দেওয়ার জন্য বিরাটসংখ্যক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে? ইস্যুভিত্তিক না, স্রেফ ব্যক্তি এবং দলভিত্তিক যে প্রতিক্রিয়া হয়, এটা বিরাট ক্ষতি করছে আমাদের ইমেজের ক্ষেত্রে, আমাদের ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে। বিদেশের মাটিতে একে অন্যের শত্রু ভাবাপন্ন মনোভাব ভাবমূর্তি নষ্ট করছে আমাদের দেশের। এসব বিষয়ে গণমাধ্যমের সহযোগিতা করতে হবে।’
ভারতের উদাহরণ দিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী কোথাও গেলে সেখানে দুয়োধ্বনি দেওয়ার জন্য কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না। আমাদের এখানে হয়। এটা চিরদিন হয়ে আসছে। এটা থেকে আমাদের বের হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভারতীয়রা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, আমরা পাই না কেন? কারণ আমরা স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত হই খুব কম। আমি যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলাম, তখন দেখেছি, ঢাকা থেকে যখন অতিথি গেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের লোকজন একসঙ্গে মিলে সংবর্ধনা দিয়েছেন। এটা কিন্তু এক্সেপশনাল, পশ্চিমে কিন্তু আমি তা দেখিনি। আমি দেখেছি সব সময় দুই ভাগ হয়ে আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় যে এভাবে একসঙ্গে কিছু করার চেষ্টা, এটা আমাদের করতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, সেদিকে তাকান। কত ভারতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসছেন। আমাদের ক্ষেত্রে কতটুকু হয়, বরং পাকিস্তানে কিছুটা হচ্ছে। বাংলাদেশিরা টাওয়ার হ্যামলেটসে কিছু হয়েছে, যুক্তরাজ্যে কয়েকজন এমপি আছেন, এটা হলো বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংয়ের...। ভারত তাদের ডায়াসপোরা তৈরি করেছে। সফটওয়্যার কোম্পানির প্রধান ভারতীয়, এগুলো হচ্ছে আসল রাস্তা ব্র্যান্ডিংয়ের। ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য আমাদের অবশ্যই ভালো কাজ করতে হবে।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কেটে যাবে, ‘তাহলেই বিনিয়োগকারীরা আসবে বাংলাদেশে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা চলে আসছে। শিগগিরই একটা রোডম্যাপ আসবে। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে সরকার কাজ করছে।’
তৌহিদ হোসেন বলেন, গত চার মাসে বিদেশে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতীয় মিডিয়া ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তারা এমন তথ্য প্রচার করছে, যাতে মনে হচ্ছে সীমান্তে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে কচুকাটা করা হচ্ছে। ভারতীয়দের অপপ্রচার রুখতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বিদেশে দূতাবাসগুলোয় প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ার অনেক অভিযোগ সত্য। তবে সব না। এর বাইরেও বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি করলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেবে সরকার।
অনুষ্ঠানে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিকার ব্যারিস্টার সাইফ উদ্দিন খালেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে আমাদের রক্তঋণ আছে। এখানে আঘাত হলে, লন্ডনেও আমরা গর্জে উঠি। আপনাদের যখন কিছুতে আঘাত লাগে, আমাদেরও আঘাত লাগে। আপনাদের দুঃখে আমাদেরও বুক ভেসে ওঠে। আমরা সবসময় আপনাদের পাশে আছি।’
বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের দুর্বলতা অনেকাংশেই কাটিয়ে উঠেছি। রেমিট্যান্স ৬ মাসে গড়ে ২৬ শতাংশ করে আছে। ছয় মাসে তিন বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আমরা একটি ভালো পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছি।’
ব্যাংকার অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘অনেক সময় দেখি বিদেশে প্রবাসীরা ঝগড়া-বিবাদ করে। এটা খুব খারাপ। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের কর্মীদের দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে।’
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী ফোর্সের সাবেক কমান্ডার মে. জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর (অব.) বলেন, ‘সেনাবাহিনী বিদেশে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করেছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ তারা খুব সুশৃঙ্খল বাহিনী। এ ছাড়া তাদের নামে কোনো যৌন হয়রানির অভিযোগ নেই। দেশের বাণিজ্য বাড়াতে শান্তি মিশনরক্ষীদের সম্পৃক্ততা করা যেতে পারে।’
রেমিট্যান্সবিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট ব্যাংকার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘রেমিট্যান্সযোদ্ধারা বাংলাদেশকে বিশ্বে চিনিয়েছেন। তাদের আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে। রেমিট্যান্সকে শুধু টাকার অঙ্কে দেখা উচিত নয়। এটাকে আরও গভীরভাবে দেখতে হবে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনআরবি চেয়ারপারসন এমএস সেকিল চৌধুরী।