মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানা ঘেরাও করে মামলার গ্রেপ্তারকৃত আসামি যুবদল নেতাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন বিএনপিদলীয় নেতকার্মীরা। গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তারিকুল ইসলামকে (৪০) শ্রীনগর বাজার থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিকে আসামি ছিনতাইয়ের প্রতিবাদে গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ধলেশ^রী টোলপ্লাজায় রোড ব্লকেড করেছেন বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা। এতে এক্সপ্রেসওয়েতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে আসামি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আশ্বাস পেয়ে দুপুর ১টার দিকে ব্লকেড থেকে সরে দাঁড়ান শিক্ষার্থীরা।
যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলামকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার ওসি কাইয়ুম উদ্দিন চৌধুরীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল বিকেলেই এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার।
মামলার আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় গতকাল দুপুরে শ্রীনগর থানায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের ২০১ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
জানা যায়, বিদায়ী বছরের ১৯ নভেম্বর যুবদল নেতার প্রতিবেশী মো. কালাম মিয়া বাদী হয়ে একটি মারামারির মামলা করেন। যুবদল নেতা ওই মামলার এজাহারনামীয় ১ নম্বর আসামি উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তারিকুল ইসলাম। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে গ্রেপ্তারের পর মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। রাত ৯টার দিকে থানায় ছুটে আসেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম খান। তিনি তারিকুলকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য থানার ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। এরপর একে একে থানায় ছুটে আসেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন মৃধা জেমস, সদস্য সচিব মামুনুর রশিদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব এমদাদুল ইসলাম রজিন, উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি আশ্রাফুল ইসলাম শুভ ও সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক ইমন। বিএনপি নেতাসহ থানায় জড়ো হন শতাধিক কর্মীও। এ সময় তারা গ্রেপ্তারকৃত যুবদল নেতাকে ছাড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠেও। চড়াও হন যুবদল নেতাকে গ্রেপ্তার করা এএসআই আজিজুল ইসলামের ওপরও। একপর্যায়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই থানা-হাজত থেকে যুবদল নেতাকে ছিনিয়ে নিয়ে যান তারা।
এ ঘটনার পর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন মৃধা জেমসের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি তা ধরেননি। উপজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম খান দাবি করেন, তিনি থানায় যাননি। তিনি বলেন, ‘আমি এলাকায় ছিলাম না। ঢাকায় দাওয়াতে ছিলাম। তবে যুবদলের এক সদস্যকে আসামি হিসেবে ধরে আনলে থানা থেকে তিনি পালিয়েছেন বলে শুনেছি।’
এদিকে মামলার এজাহারনামীয় আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় গতকাল দুপুরে শ্রীনগর থানায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের ২০১ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আসামি ছিনতাইয়ের প্রতিবাদে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেছেন।
শ্রীনগর থানার ওসি মো. কাইয়ুম উদ্দিন চৌধুরী জানান, থানা থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দুপুর দেড়টার দিকে এসআই আবদুর রাজ্জাক বাদী হয়ে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকর্মীদের নামে মামলা করেন। মামলায় ৩১ জনের নাম উল্লেখসহ ২০১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ওসি বলেন, ‘মামলার আসামিকে থানা থেকে ছিনিয়ে নেওয়া, পুলিশকে মারধর করে আহত করা এবং থানা কার্যালয় ভাঙচুর করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
এদিকে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে জেলার সিরাজদীখান উপজেলার কুচিয়ামোড়া এলাকার অদূরে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ধলেশ^রী টোলপ্লাজায় রোড ব্লকেড করেন বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা। এতে এক্সপ্রেসওয়েতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে আসামি ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আশ^াস পেয়ে দুপুর ১টার দিকে ব্লকেড থেকে সরে দাঁড়ান শিক্ষার্থীরা।
বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী নূরজাহান বলেন, ‘শ্রীনগর থানা থেকে আসামি ছিনিয়ে নিয়েছে বিএনপি। এখনো যদি এমন হয়, তাহলে কীভাবে চলবে। আওয়ামী লীগের সময় যেমন হয়েছে, সেটা এখন বিএনপি করছে। এরই প্রতিবাদে আমরা আজ (গতকাল) সড়কে অবস্থান করেছি। আমরা চাই, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা হক।’
সিরাজদীখান সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আ ন ম ইমরান খান বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে মহাসড়ক থেকে সরে যান তারা। এতে প্রায় এক ঘণ্টা পর এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।’
শুক্রবার রাতে শ্রীনগর থানা থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে। ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। রাতের ওই ঘটনার সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখা হচ্ছে। পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনবে।