চট্টগ্রামে সমন্বয়কদের দুই গ্রুপের হাতাহাতি

চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিফলেট বিতরণ কর্মসূচির পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় দুই সমন্বয়ক রাসেল ও রাফির দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে। দুই ভাগে বিভক্ত তারা এবং তাদের অনুসারীরা।

শনিবার (১১ জানুয়ারি) বিকেলে প্ল্যাটফর্মটির মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ এবং অন্যান্য সমন্বয়ক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ করেন কেন্দ্রীয় কমিটিরি নির্বাহী সদস্য রাসেল আহমেদ। আর এই অভিযোগের তীর—শীর্ষ সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক রিজাউর রহমানের বিরুদ্ধে। 

শনিবার রাতে হামলার বিস্তারিত নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে শীর্ষ সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ ও তার অনুসারীরা। একপর্যায়ে সেখানে রাফি-রিজাউর তাদের অনুসারীদের নিয়ে উপস্থিত হলে উভয় পক্ষ হাতাহাতি ও বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে।
 
হামলার অভিযোগ এনে রাতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে সংবাদ সম্মেলন রাসেল বলেন, ‘আজকের লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি জিইসি মোড়ে এসে শেষ করি। পরবর্তীতে আমরা আগামী কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে আলাপের জন্য একটি অফিসে বসি। সেখানে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর রাফিকে ফোন দিয়ে পাচ্ছিলাম না। প্রায় ৩০ মিনিট পর সে দলবল নিয়ে আসে। সেখানে ১০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠা সমন্বয়ক রিজাউর তার নিয়ন্ত্রণে থাকা ডট গ্যাংকে নিয়ে আসে। এসে আবদুল হান্নান মাসউদকে প্রশ্ন করেন তাকে কেন জানানো হয়নি। তিনি বলেছেন, হু আর ইউ? যেহেতু তিনি কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক তিনি সবাইকে চেনেন না এটাই স্বাভাবিক।’

রাসেল বলেন, ‘এরপর সমন্বয়ক রিজাউর র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ডট গ্যাং সদস্য সাদিক আরমান, নিজামুদ্দিনসহ আরও অনেক উগ্র ছেলে-মেয়েকে নিয়ে মাসউদ ভাই এবং আমাকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। আমরা একটা রুমে আশ্রয় নিই। প্রায় একঘণ্টা সেখানে আমরা অবরুদ্ধ ছিলাম। তারা বারবার সেখানে উস্কানিমূলক স্লোগান দিচ্ছিল। একপর্যায়ে তারা সেখানে ভাঙচুরও করে। যার সিসিটিভি ফুটেজও রয়েছে।’পরে আমরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাহায্যে বের হয়ে আসি।
 
তিনি বলেন, তাদের হামলায় তানভীর শরীফ, ওমর ফারুক সাগর, নাছির উদ্দিন, নওশাদ, ইফতি, মাহমুদ আলম, শফিকুল ইসলামসহ আমাদের অনেক সহযোদ্ধা আহত হন।

সংবাদ সম্মেলনে ওমর ফারুক সাগর বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করি এবং সে সময় গুলি খাই। ৫ তারিখের আগে কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের যে অনুসারীরা আমাদের ওপর ষোলশহরে হামলা করেছিল তারাই শনিবার আমাদের ওপর হামলা করে এবং জুলাইতে আমার যে স্থানে গুলি লাগে সে স্থানে আমাকে আঘাত করে। সে সময় তাদের হাতে রড ছুরিসহ ধারালো অস্ত্র ছিল। 
 
ওয়াসা এলাকার সভায় উপস্থিত একজন নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘মিটিং চলাকালীন সময়ে হঠাৎ রিজাউরসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা সেখানে উপস্থিত হন। এসেই মাসউদকে জিজ্ঞেস করেন,‘আপনারা প্রোগ্রাম করেছেন কাকে জানিয়েছেন’। উনি উত্তর দিলেন, ‘ফেসবুকেই তো এটা প্রচার করা হয়েছে এরকম একটা প্রোগ্রাম হবে’। রিজাউর তখন জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি আমাকে জানাননি কেন’। তখন মাসউদ জবাব দেন, ‘চট্টগ্রামের রাসেল-রাফিসহ যাদেরকে বলা দরকার তাদের বলেছি। আমি আপনাকে চিনি না। আপনি কে’। এরপরই রিজাউরকে ঘিরে অন্যরা ‘সমন্বয়ক-সমন্বয়ক’স্লোগান দিতে থাকে।’

রাসেলের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যের একপর্যায়ে সেখানে হাজির হন সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি, রিজাউর রহমান এবং ছাত্র আন্দোলনে আহত এক শিক্ষার্থী। তাদের দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন রাসেলের অনুসারীরা। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ‘হামলাকারীদের সাথে বসব না’বলে চিৎকার করতে থাকেন। এরই মধ্যে সেখানে রাফির পক্ষে থাকা আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত হন। এ সময় উভয়পক্ষ একে অপরকে উস্কানিমূলক পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে সেখানে উভয়পক্ষের কয়েকজন হাতাহাতিতে লিপ্ত হন। প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ মাইক্রোফোন বন্ধ করে দিলে উভয়পক্ষ ক্লাবের সামনে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। সেখানেও তারা পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিতে থাকেন।
 
সংবাদ সম্মেলন থেকে বের হয়ে খান তালাত মাহমুদ রাফি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের পূর্বঘোষিত কোনো কর্মসূচি ছিল না। হান্নান ভাই শুক্রবার রাতে আমাকে কল দিয়ে বলেন তিনি আজ চট্টগ্রামে আসবেন। সে জন্য এ লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি করা হয়েছে। তিনটায় যেহেতু কর্মসূচি, সেহেতু আমার ক্যাম্পাস থেকে আসতে দেরি হয়েছে। আমার ওখানে যেতে চারটা বেজে গেছে। যে হামলার কথা বলা হচ্ছে সেখানে আমি জড়িত ছিলাম না। কে বা কারা এ হামলার সঙ্গে জড়িত তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’

রাফি আরও বলেন, ‘আমার ও রিজাউরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ সেগুলো কেউ যদি প্রমাণ করতে পারে তাহলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আমরা কেউ থাকব না। কিন্তু প্রমাণ করতে হবে। যে নোংরা রাজনীতি চলছে সেটার বন্ধ চাই।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক রিজাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, লিফলেট বিতরণ শেষে আমাদের সভায় আমরা নানা বিষয়ে মুখ্য সংগঠক আব্দুল হান্নান মাসউদ থেকে জানতে চাইলে তিনি আমাদের জবাবদিহি করতে বাধ্য নয় বলে শাসান। এরপর মাসউদ , রাসেল বাইরে থেকে কিছু টোকাই পোলাপান এনে আমাদের ওপর হামলা করে । এরপর তারা সিএনজি নিয়ে চলে যায়। সে সময় আহত হন জুনায়েদ, নিজাম উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন। 

তিনি আরও বলেন, ‘জিইসি মোড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়েছে। এই হামলা কারা করেছে? যারাই করছে সে ফুটেজগুলো আমাদের কাছে আসতেছে। আমরা এটা দিব আপনাদের। তারা যে ডট গ্যাং বলে বলে আন্দোলনকারীদের মারার কালচার তৈরি করতেছে; আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের সমন্বয়কদের দুপক্ষে ঝামেলা হয়েছে। সেখানে বাইরের কেউ ছিল না। বিষয়টি তারা নিজেরাই সমাধান করতে আগ্রহী বলে জানান ওসি। 

মূলত নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের অনুসারীদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‘ডট গ্যাং’। যার সদস্য নানা অপকর্মে জড়িত কিশোর অপরাধীরা। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে এই গ্যাং এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাস সুমনের নাম উঠে এসেছিল৷ ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নগরের চকবাজার থানার নবাব সিরাজউদৌলা রোড বালি আর্কেড শপিং সেন্টারের সামনে থেকে কিশোর গ্যাং ‘ডট গ্যাং’ গ্রুপের প্রধানসহ ৭ সদস্যকে আটক করেছিল র‌্যাব।