ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর আওয়ামী লীগের ৩৩ জন গুলি চালিয়েছে। তাদের সবাই ফেনীর ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত নিজাম হাজারীর অনুসারী বলে জানা গেছে। কিন্তু এখনো তাদের আইনের আওতায় আনা হয়নি।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একে-৪৭, এম-৪২ এর মতো দেখতে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়েছে। সেদিন মহিপালে চার শিক্ষার্থীসহ ৯ জন নিহত ও আহত হয় শতাধিক।
এ হতাহতের ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় দায়েরকৃত ১৯ মামলায় পাঁচ মাসে ৩৩২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে ৮টি হত্যা ও ১১টি হত্যাচেষ্টার মামলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ১০১ জন এজাহারনামীয় এবং ২৩১ জনকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আটক করা হয়। এর মধ্যে ৫ জন দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ২১০ জনের মধ্যে ৫৭ জন এজহারনামীয় ও হামলার মামলায় ১২২ জন গ্রেপ্তার হলেও তাদের মধ্যে ৪৪ জন এজহারনামীয় রয়েছেন।
তবে, গত ৪ আগস্ট মহিপালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যাকা-ে জড়িত ৩২জন অস্ত্রধারী এখনো গ্রেপ্তার হননি। ওইদিন ছাত্র-জনতার ওপর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গুলি চালানোর কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও ফুটেজে অন্তত ৩৩ জনকে অস্ত্রসহ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করতে দেখা গেছে।
ভিডিও ফুটেজে যাদের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জিয়াউদ্দিন বাবলু, ফেনী সদরের কাজীরবাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ, সদর উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান করিম উল্লাহ ওরফে রেন্সু করিম, জেলা যুবলীগের সহসভাপতি ও শর্শদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জানে আলম ভূঁইয়া এবং জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লুৎফর রহমান ওরফে খোকন হাজারী। তারা সবাই ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম হাজারীর অনুসারী। শনাক্ত হওয়া ৩৩ জন অস্ত্রধারীর মধ্যে ১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। সে ফেনী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি ওরফে লিটন। তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে লিটন আদালতকে জানিয়েছেন, ৪ আগস্ট সকালে তিনিসহ ৮ জন পৌরসভায় আসেন। সেখানে আরও ৩শ থেকে ৪শ লোক ছিল। নিজাম উদ্দিন হাজারী সবার উদ্দেশ্যে রাখা বক্তব্যে যেকোনো মূল্যে ছাত্র-জনতাকে প্রতিহত করার নির্দেশ দেন।
এরপর মাস্টারপাড়া থেকে সাদা প্রাইভেটকারের মাধ্যমে ব্যাডমিন্টন ব্যাগে করে শটগান আনা হয়। পৌরসভার লিবার্টি সুপার মার্কেটের নিচতলায় কৃষকলীগের অফিস কক্ষে লিটনসহ ৮ জনকে ডেকে নিয়ে ৮টি শটগান ও ১০ রাউন্ড করে গুলি দেন রফিক ও বাবলু। যারা অস্ত্র চালাতে জানতেন না তাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়। তিনি জানান, মহিপালে হামলার সময় জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য মজিবুল হক রিপন ও ফুলগাজী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক হারুন মজুমদারকে অনুসরণ করতে অস্ত্রধারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়। ৪০-৫০ জন বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও ১শ থেকে ২শ জন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহিপালের দিকে যান। অস্ত্রধারী ও অস্ত্র ছিল না এমন বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নাম আদালতকে জানান লিটন। মহিপালে ছাত্র-জনতার গুলি করার সময় চৌধুরীবাড়ির মুখে অবস্থান করায় ওপরের দিকে ৮ রাউন্ড গুলি ছোড়েন লিটন। সংঘর্ষ শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে কৃষকলীগের অফিসে গিয়ে রফিক-বাবলুর কাছে অস্ত্র জমা দেন তারা। এ সময় ব্যবহার না হওয়া ২ রাউন্ড গুলিও ফেরত দেন লিটন।
অস্ত্রের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ফেনী জেলায় ব্যক্তিপর্যায়ে ১০৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। নিজাম উদ্দিন হাজারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের নামে একটি পিস্তল ও রাইফেলের লাইসেন্স নেন। রাইফেলের ২০১৬ সালে, পিস্তলের লাইসেন্স নেন ২০১৮ সালে। নিজাম হাজারী তার স্ত্রী নূরজাহান বেগমের নামেও ২০২০ সালে একটি রাইফেলের লাইসেন্স করান। যদিও তিনি গৃহিণী।
ফেনীর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা একটি করে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স করেছিলেন, তারা হলেন ছাগলনাইয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী ও মিজানুর রহমান, একই উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল হায়দার চৌধুরী, মহামায়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গরীব শাহ হোসেন, ফেনী সদরের ফাজিলপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুল হক, সাবেক মেয়র হাজি আলা উদ্দিন। একটি করে অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় আছেন ফেনী জেলা যুবলীগের সভাপতি ও দাগনভূঞা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান দিদারুল কবির, একই উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এছহাক, দাগনভূঞা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র ওমর ফারুক খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দাগনভূঞার জায়লাস্কর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ মিলন, দাগনভূঞা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন মামুন, ছাগলনাইয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মোস্তফা ও সোনাগাজী পৌরসভার সাবেক মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন।
এ ছাড়া ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রহিম উল্লাহর নামে একটি শটগান, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন মাহমুদের নামে একটি পিস্তল, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শেখ আবদুল আবদুল্লাহর নামে পিস্তল, জেলা যুবলীগের সহসভাপতি রাসেদুল হকের নামে শটগান, জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী আহমেদ রিয়াদ আজীজের নামে শটগান এবং ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আহাম্মদ মাহি ওরফে রাসেলের নামে একটি করে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন সময়ে দলীয় বিবেচনায় তারা আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছিলেন। এসব অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ দমনের কাজে।
অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মর্ম সিংহ ত্রিপুরা বলেন, অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারে অভিযান নিয়মিত চলছে।
ফেনীর পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর যারা গুলি চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।