শেখ হাসিনার কণ্ঠ যাচাইয়ের নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের

জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকান্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ জড়িতদের গুরুত্বপূর্ণ কল রেকর্ড পাওয়া গেছে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। একইসঙ্গে গুমের ঘটনায় তথ্যপ্রমাণও মিলেছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছেন তারা। আর এগুলোর বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানানোর পর এসব ভয়েস রেকর্ডিংয়ের সত্যতা যাচাই করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল গতকাল সোমবার এ আদেশ দেয়। জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান ঠেকাতে গণহত্যা এবং পরবর্তী সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভয়েস রেকর্ডিং থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য দৃশ্যমান বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটররা।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট দেশ ছাড়েন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্দোলন দমাতে হাজারের বেশি মানুষ হত্যার অভিযোগ রয়েছে তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে। গত ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এসব গণহত্যার অভিযোগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে সরকার। বিভিন্ন সময়ে প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়, ঘটনার সময়ের ভিডিও ফুটেজ, গণহত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডসহ ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ তারা সংগ্রহ করছেন এবং এগুলো সাক্ষ্য ও প্রমাণ হিসেবে বিচারের সময় উপস্থাপন করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গতকাল এ আবেদনটি করা হলো।

ইতিমধ্যে গণহত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গুমের অভিযোগে পৃথক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। দেশ ছাড়ার পর বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলীয় নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন প্রচার হয়। প্রসিকিউশনের আবেদনের পর গত ৬ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিভিন্ন মাধ্যমে শেখ হাসিনার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেয়।  

গতকাল ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে এই আবেদনটি করেন। তিনি আদালতে বলেন, তারা (প্রসিকিউশন) বিভিন্ন উৎস থেকে শেখ হাসিনা এবং তার ঘনিষ্ঠজনদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভয়েস রেকর্ড (গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে) পেয়েছেন। এর কিছু বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আসছে। এগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে বিটিআরসি এবং সিআইডির প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন। শুনানি নিয়ে আদালত বিটিআরসি ও সিআইডির উদ্দেশ্যে এ নির্দেশনা দেয়।

গতকাল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের একাধিক প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাজারের বেশি খন্ড খন্ড ভয়েস রেকর্ড তারা সংগ্রহ করেছেন। যার বেশিরভাগে শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বর দৃশ্যমান হলেও অপর প্রান্তে কে বা কারা ছিলেন তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আর এটি নিশ্চিত হতেই আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই- আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় এবং পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার কিছু ভয়েস রেকর্ড ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে। কিছু পাওয়া গেছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেখানে তাকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে শোনা গেছে। এখন এগুলো আদৌ তার বক্তব্য কি না এবং তিনি এসব নির্দেশনা দিচ্ছেন কি না তা নিশ্চিত হতে হবে। এর জন্যই আমরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলাম। আদালত ভয়েস রেকর্ডগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে।’ তিনি জানান, আজ মঙ্গলবার আদালতের এই আদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বিটিআরসি ও সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তবে, এর বাইরে আর কিছু বলতে চাননি তিনি। 

নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান ও গণহত্যা এবং পরবর্তী সময়ে এক হাজারের বেশি ভয়েস রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে। যাতে শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা তার নির্দেশনা পৌঁছে দিতে অন্য কাউকে নির্দেশ দিয়েছেন তা দৃশ্যমান। যাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা আছেন। তবে, ভয়েস রেকর্ডের অনেকগুলো অস্পষ্ট। কিছু রেকর্ডে শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বর দৃশ্যমান মনে হয়েছে। কিন্তু তিনি কাকে বা কাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, অপরপ্রান্তে কারা আছেন সে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ জন্যই ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন। সত্যতা নিশ্চিত হলে এগুলো ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে শুনানিতে উপস্থাপন করা হবে।’      

গতকাল দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ডিজিটাল তথ্য উপাত্ত। আর এগুলো আদালতে উপস্থাপন করার আগে এর সার্টিফিকেশনের (যাচাই) প্রয়োজন হয়। এই সার্টিফায়েড অথরিটি হচ্ছে সিআইডি। তারা এটা যাচাই-বাছাই করবে যে এটা সঠিক কি না অথবা এটা ভুয়া কি না অথবা এটা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি) দিয়ে বানানো কি না। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া এসব তথ্য-উপাত্ত আদালতে জমা দেওয়া যায় না। এটা আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশের উভয় আইনেই আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রচুর ডিজিটাল এভিডেন্স সংগ্রহ করেছি। ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিও, বিভিন্ন জায়গার কল রেকর্ড মেসেজ বিভিন্ন সংস্থা, ব্যক্তি উৎস ও সংবাদমাধ্যম থেকে এগুলো আমরা পেয়েছি। আমরা এখান থেকে বেছে বেছে ওই ভয়েস, ভিডিও, মেসেজগুলো ডিজিটালি ফরেনসিক চেক করার জন্য সিআইডির কাছে পাঠানোর জন্য নির্দেশ চেয়েছি।’ 

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। ভয়েস রেকর্ড যাচাইয়ের পর সত্যতা নিশ্চিত হলে এগুলো বিচারের কোন প্রক্রিয়ায় বা কীভাবে তথ্যপ্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে দেশ রূপান্তরের এমন এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা প্রসিকিউশনের প্রসিডিংয়ের (আইনি প্রক্রিয়া) বিষয় এবং এ বিষয়ে এখনই আমরা কোনো কিছু বলতে চাই না।’