দেশের ৩২টি কারাগারে বন্দিদের হাতে তৈরি ৩ শতাধিক পণ্য বিক্রি হচ্ছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়। এসব পণ্য বিক্রির জন্য মেলা প্রাঙ্গণের পূর্বপাশে ‘কারাপণ্য বাংলাদেশ জেল’ নামে প্যাভিলিয়ন সাজানো হয়েছে। এর প্রধান ফটক করা হয়েছে কেন্দ্রীয় কারাগারের আদলে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এ যেন ‘মিনি জেলখানা’। তবে ভেতরে প্রবেশ করলেই পাল্টে যাবে ধারণা। পুরো প্যাভিলিয়ন সেজেছে বাঁশ, বেত, কাঠ ও পাট দিয়ে তৈরি বাহারি পণ্যে।
মেলার ১৩তম দিনে গতকাল সোমবার কারাবন্দিদের তৈরি পণ্যের প্যাভিলিয়নে ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ৬৮টি কারাগারে দীর্ঘমেয়াদি বন্দি রয়েছেন প্রায় ৮৪ হাজার। তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়েছে নানা ধরনের পণ্য তৈরি। ২০১৮ সাল থেকে কারাপণ্য নিয়ে বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করছে কারা কর্তৃপক্ষ। গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ ও ২, মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, নারায়ণগঞ্জ কারাগার, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, যশোর জেলা কারাগার, ফরিদপুর জেলা কারাগার, খুলনা জেলা কারাগারসহ ৩২টি কারাগারে বন্দিদের হাতে তৈরি ৩২৫টির অধিক পণ্য প্যাভিলিয়নে তোলা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কারাপণ্যের প্যাভিলিয়নে বাঁশ ও বেতের তৈরি মোড়া, প্লাস্টিকের কুলা, কাঠের বুকশেলফ, খুন্তি, শো-পিস, একতারা, পাটজাত পণ্যের মধ্যে ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, নকশিকাঁথা, টিস্যু বক্সসহ নানা পণ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে। কৌতূহল নিয়ে অনেকেই ঢুকছেন, ঘুরে ঘুরে দেখছেন পণ্য। বাঁশ ও বেতের পণ্যতে দৃষ্টি ছিল কারও কারও। বাড়তি আকর্ষণ ছিল পুঁতি দিয়ে তৈরি নানা সৌন্দর্যবর্ধক পণ্য। অনেকেই কিনছেন পছন্দের জিনিসটি। তবে নকশিকাঁথা ও জামদানি শাড়ির দিকে নজর বেশি ছিল দর্শনার্থী এবং ক্রেতাদের।
প্যাভিলিয়নে দায়িত্বরত কারারক্ষী মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্যাভিলিয়নে কারাবন্দিদের তৈরি পণ্যের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মেলা শেষ হওয়ার আগেই পণ্য শেষ হয়ে যাবে।’
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে আসা হালিম মিয়া বলেন, ‘প্রতিবছরই মেলায় এসে কারাপণ্যের স্টল (প্যাভিলিয়ন) খুঁজে বের করি। এখানকার গামছা ও ঝাড়ুগুলো অনেক ভালো হয়। এ কারণে এক বছরেরটা একেবারে কিনে নিয়ে যাই। দামও বেশ কম।’
উত্তরা থেকে মেলায় আসা সানজিদা আলমগীর বলেন, ‘কারাবন্দিদের হাতে তৈরি পণ্যগুলো দেখলাম, বেশ ভালোই লাগল। প্রয়োজনীয় কয়েকটি জিনিস কিনলামও। এখানকার পণ্যের গুণগত মান যেমন ভালো, দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে।’
কারাপণ্যের প্যাভিলিয়নের ইনচার্জ ডেপুটি জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য শুধু পণ্য বিক্রি নয়। সমাজকেও আমাদের কিছু দেওয়ার আছে। কারাবন্দিরা যদি কারাগারে থেকে এত সুন্দর ও নিখুঁতভাবে পণ্য তৈরি করতে পারেন, তাহলে যারা বাইরে আছেন, তারা চাইলে আরও ভালো কিছু করতে পারেন। কারাগারে তৈরি পণ্যের উদ্দেশ্য শুধু বিক্রি নয়, কারাবন্দিদের সংশোধন করা ও সাজা শেষে তারা যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা। ৩৮টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৬৯ হাজার কারাবন্দিকে। বর্তমানে ১৮ হাজার কারাবন্দি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তাদের হাতে তৈরি পণ্য দিয়ে মেলায় কারাপণ্য প্যাভিলিয়ন সাজানো হয়েছে। প্রতিবারই মেলায় পণ্য বিক্রির লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ কারাবন্দিদের এবং আর বাকি ৫০ ভাগ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। বন্দিরা এ অর্থ খরচ করতে পারেন এবং পরিবারের কাছে পাঠাতেও পারেন।’
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সচিব ও বাণিজ্য মেলার পরিচালক বিবেক সরকার বলেন, প্রতিবছরই কারাপণ্যের স্টল মেলায় থাকে। এবারও রয়েছে। কয়েদিদের তৈরি পণ্যে সাধারণ মানুষের বেশ আগ্রহ থাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘মেলায় আগের দিনগুলোর চেয়ে ক্রেতা ও দর্শনার্থী বেড়েছে। তাদের কথা মাথায় রেখে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মেলায় এসে কারও যেন কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সেদিকে আমাদের নজর রয়েছে।’