গাজীপুরে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের রেকর্ডপত্র অযত্ন আর অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও নষ্ট হওয়ার সুযোগে এক শ্রেণির ভূমি জালিয়াত ও প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছে। এতে নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন জমির প্রকৃত মালিক। এসব জালিয়াত চক্রের কারণে ভূমি জটিলতার মামলায় বছরের পর বছর আদালতে ঘুরছেন জমির মালিকরা। জাল-জালিয়াতি করে জমির দলিল তৈরি করে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া হচ্ছে জমি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় জেলা শহরের জোরপুকুর পাড়ের একটি ভবনে কয়েক বছর ভাড়ায় অফিস থাকার সময় ওই ভবনের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক রেকর্ড নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে শত বছর আগের বালাম বই, থাম বই ও ইনডেক্স রয়েছে। রেকর্ড রুমের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার জানালেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানিয়েছেন রেকর্ড রুমের কর্মচারীরা। এতে জমি কেনাবেচার সময় রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের অবিকল নকল আনতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। মাসের পর মাস ঘুরেও মিলছে না নকলের কপি। রেকর্ড ছেঁড়া এবং নষ্ট থাকায় কর্মচারীরা তল্লাশি করতে পারছেন না এবং নকলও সরবরাহ করতে পারছেন না। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রেকর্ড রুমের কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতিনিয়তই ঝামেলা তৈরি হচ্ছে। রেকর্ড বইয়ের পাতা ছেঁড়া থাকায় অসাধু প্রতারক চক্র এ খবর জানতে পেরে নষ্ট হয়ে যাওয়া রেকর্ডের দলিল নম্বর দিয়ে জাল দলিল তৈরি করে জমির আসল মালিকদের প্রতারিত করছেন।
সৈয়দ হুমায়ূন কবীর নামে একজন জমির মালিক জানান, তিনি শ্রীপুরের মাওনায় কেওয়া মৌজায় প্রায় ছয় বিঘা জমি ক্রয় করেন। কিছুদিন পর জানতে পারেন কুদ্দুস ফকির নামে জনৈক এক ব্যক্তি ওই মৌজায় ৮৭ শতাংশ জমির মালিক। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন কুদ্দুস ফকির যে দলিল দিয়ে জমির মালিক হয়েছেন সে দলিলটি জাল। ওই দলিলের কোনো সার্টিফাই কপি কুদ্দুস ফকির দেখাতে পারেননি। তারপরও ওই জাল দলিল দিয়ে ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে জমির নামজারি করেছেন। শত কোটি টাকা মূল্যের জমিটি এখন প্রভাবশালী মহলের দখলে।
এদিকে ওই কুদ্দুস ফকিরের ৭৭৭২ নম্বর দলিলের খোঁজ নিতে গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে গেলে তিন মাসেও ওই দলিলের নকল দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। পরে জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহারের দ্বারস্থ হলে তিনি রেকর্ড কিপারকে ডেকে এ বিষয়ে জানতে চান। পরে রেকর্ড কিপার বালাম বই এনে দেখালে এতে দেখা যায় ওই দলিল নম্বরের রেকর্ডের চারটি পাতা ছেঁড়া এবং বালাম বই থেকে পাতা উধাও। বালাম বইয়ের পাতা না থাকার সুযোগটি নিয়েছে দলিল জাল-জালিয়াতির চক্রটি। জাল দলিল দিয়েই হুমায়ূন কবীরের জমি দখল করে রেখেছে একটি প্রভাবশালী মহল। দলিলের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হলেও তা এখনো বিচারাধীন। এ সুযোগে শত কোটি টাকা মূল্যের জমিটি হয়ে যায় হাতছাড়া।
বিরোধপূর্ণ জমিটি একাধিক ব্যক্তির কাছে পাওয়ারনামা দেওয়া হয়। পাওয়ার সূত্রে মালিক শ্রমিক দল নেতা কাজল ফকির বলেন, আমাদের দলিল সঠিক। জমির নামজারি আমাদের পক্ষে, আর আদালতও আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছে।
গাজীপুর সদর উপজেলার নয়াপাড়া ডগরী এলাকার বাসিন্দা লোকমান হোসেন। তিনি ১৯৭০ ও ১৯৭২ সালে ডগরীর মৌজায় ৭০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন ওই জমিতে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করে তার স্ত্রী সন্তানরা অদ্যাবধি বসবাস করছেন।
২০১৬ সালের ৯ জুন লোকমান হোসেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে ওয়ারিশ রেখে মারা যান। এরপর জমিটির ওপর চোখ পড়ে চাঁদপুরের হাইমচর এলাকার মো. বিল্লাল হোসেন, গাজীপুর সদরের মো. নজরুল ইসলাম, সরুজ্জামান, মো. সোলায়মান, মো. আবুল খায়ের, মো. আমিরুল ইসলাম ও মো. জাহাঙ্গীর আলম নামের কয়েকজনের। তারা মো. বিল্লাল হোসেনের নামে ৭০ শতাংশ জমির মধ্যে ৫৩ শতাংশ জমির জাল দলিল তৈরি করে জমিটি দখল করার চেষ্টা চালান। জমিটি দখলে নেওয়ার জন্য গাজীপুরে বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের দ্বারস্থ হন। বিএনপির নেতারা ওই জমিটি দখল করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে পরিবারটির সদস্যরা অভিযোগ করেন জয়দেবপুর থানায়। জমিতে থাকা দোকানপাট ভাঙচুর করে এবং বাড়িতে গিয়ে জমি খালি করে দেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। জমিসংক্রান্ত বিরোধে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশেরও কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করে ভুক্তভাগী পরিবার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, লোকমান হোসেন জমি কেনার এক বছর আগের ৮০২ নম্বর দিয়ে ৫৩ শতাংশ জমি ক্রয় দেখিয়ে একটি দলিল তৈরি করেন। ওই দলিল দিয়ে গোপনে জমির নামজারি করে নেন। এক্ষেত্রে লোকমান হোসেনের নামজারি বাতিল করা হলেও তাদের লোকজনকে ভূমি অফিস থেকে কোনো নোটিস করা হয়নি। গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে দেখা যায় ১৯৬৯ সালে যে দলিলটি বিল্লাল হোসেন দেখিয়েছেন তার মূল ভলিয়মের সঙ্গে মিল নেই। দাতা গ্রহীতাও ভিন্ন। দলিলের সন্ধানে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে সেখানেও ১৯৬৯ সালের ৮০২ নম্বর দলিলটির কোনো সন্ধান মেলেনি।
বিল্লাল হোসেনদের কাছে তাদের দলিলের মূল দলিল বা অবিকল নকলের কপি চাইলেও তারা তা দেখাতে পারেনি। এ জন্য তারা জমির মূল মালিকদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আর এ সুযোগে প্রভাশালীদের দিয়ে জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন জমির মালিক ফরিদা আক্তার। এ বিষয়ে বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দলিল লেখকরা বলেন, অনেক জমির মালিক আমাদের কাছে আসেন তাদের দলিলের নকল নেওয়ার জন্য। আমরা মাসের পর মাস চেষ্টা করেও তাদের দলিলের নকল সরবরাহ করতে পারি না। এ কারণে জেলায় জমিসংক্রান্ত জটিলতা দিন দিন বাড়ছে।
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহার বলেন, জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়টি নিজস্ব ভবনে আসার আগে জেলা শহরে যে ভবনটিতে রেকর্ডপত্র সংরক্ষিত ছিল সে ভবনটি ছিল রেকর্ডপত্র রাখার অনুপযোগী। সেখানে অনেক রেকর্ডপত্র নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন নিজস্ব ভবনে সব রেকর্ডপত্র সুরক্ষিত আছে। আর দলিল জাল জালিয়াতির বিষয়টি আদালত দেখবে।