আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে দেশের মানুষ। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার গুঁড়ো দুধ, বিস্কুট, আচার, টমেটো, জুস, ফলমূলসহ শতাধিক পণ্য ও সেবার মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। এতে মানুষের ওপর ভ্যাটের চাপ আরও বাড়বে। বাড়তি দামে কিনতে হবে নিত্যপণ্য, সেবা নিতেও দিতে হবে বাড়তি পয়সা। ইতিমধ্যে অনেক পণ্যই বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। আসন্ন রমজানে বাড়তি দামের রথ কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে সেটি নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। বিশেষ করে ফলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা নিয়ে ভোক্তা-বিক্রেতা সবার মধ্যেই রয়েছে উদ্বেগ। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এবার রোজায় ইফতারের পদ থেকে বাদ রাখতে হবে ফল। এ ছাড়া বাড়তি দামের এই খড়গ দীর্ঘমেয়াদে মানুষের প্রয়োজনীয় পুষ্টি তালিকাকেও কাঁটছাট করবে।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, ব্যয়ের তুলনায় আয় ঘাটতি থাকায় দীর্ঘ সময় থেকেই দেশের মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। নতুন করে ফলের দাম বাড়ায় তা আরও প্রকট হবে। মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকবে। বাড়বে চিকিৎসা ব্যয়।
গত বৃহস্পতিবার এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের নির্দেশনা জারি সঙ্গে সঙ্গে বাজারে দাম বৃদ্ধি কার্যকর করে ফেলেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে সব ধরনের ফলের কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে সব থেকে বেশি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে লাল আঙুরের দাম। এর পরেই কেজিতে ১০০ টাকা বেড়েছে আনারের দাম।
সম্প্রতি বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি ফলের পাশাপাশি আমদানিকৃত ফলও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। গেল তিন দিনের ব্যবধানে আপেল, কমলা, আঙুর, বেদানা, নাশপাতির কার্টনপ্রতি বেড়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। দাম বেড়ে প্রতি কেজি সাদা আঙুর বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকায়, যা কদিন আগেও বিক্রি হয়েছিল ৪০০ টাকায়। কেজিতে ২০০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি লাল আঙুর বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। কেজিতে ১০০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি এ গ্রেডের আনার বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। আনারের মতো দাম বেড়ে প্রতি কেজি গালা আপেল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা, নাশপতি-মাল্টা ৩২০ থেকে ৩৩০ ও প্রতি কেজি আমদানিকৃত স্ট্রবেরি আপেল বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়।
আমদানিকৃত ফলের পাশাপাশি দাম বেড়েছে দেশীয় ফলের। কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি ভালো মানের পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা, পেঁপে ৭০ থেকে ১২০ ও প্রতি কেজি বরই বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এমনিতেই সাধারণ মানুষ কষ্টে রয়েছে। বাজারে আসা অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলছেন, বছর জুড়ে চড়া দাম থাকায় ফলের প্রতি তেমন আগ্রহ থাকেনি। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু ফল কিনতে হচ্ছে। তাও আগের থেকে চড়া দামের কারণে রোগীর জন্য পর্যাপ্ত ফল কেনা যাচ্ছে না। তেমনি একজন মো. শাহাদাত হোসাইন। ডেঙ্গু আক্রান্ত স্ত্রীকে ভর্তি করিয়েছেন রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে। ডাক্তারের পরামর্শে মাল্টা কিনতে এসে দামের বাড়াবাড়ি দেখে হতবাক হয়েছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে শাহাদাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতাল এলাকা হওয়ায় বাজার থেকে বেশি দামে ফল বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। তার ওপর সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত তা আমাদের জন্য আরও বেশি চাপ বাড়িয়েছে। কয়েক দিন আগে প্রতি কেজি মাল্টা কিনেছিলাম ২৮০ টাকায়। এখন তা কিনতে হচ্ছে ৩৫০ টাকায়। কেজিতে ৭০ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। এটি শুধু শাহাদাতের একার গল্প না। সারা দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের প্রত্যেক মানুষ বাজারে ফল কিনতে এসে হতবাক হচ্ছেন। আবার অনেকে ফল না কিনেই বাসায় ফিরছেন।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গেল বৃহস্পতিবার থেকেই বাদামতলী বাজারের ফল ব্যবসায়ীরা ফলের দাম বাড়ার বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছেন। শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যকারিতা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে মোহাম্মদপুরের ফল ব্যবসায়ী জলিল মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিন দিন আগে থেকেই ফলের দাম বাড়ার বিষয়ে আমদানিকাররা ঘোষণা দিয়েছেন। ফলের আমদানি শুল্ক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলের দাম বেড়েছে। প্রতিটি ফলের কেজিতে কম-বেশি পাইকারিতে ৩০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবসময় ফলের আমদানি শুল্ক অনেক বেশি থাকে। সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত ফলের ওপর শুল্ক বাড়ায় এর দাম আরও বেড়েছে। তার ওপর আগে থেকেই চড়া দাম থাকায় ফল এখন কম আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। নতুন করে শুল্ক বাড়ানোর কারণে স্থায়ীভাবেই অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে ফল। রোজায় সিন্ডিকেট সক্রিয় হলে মধ্যবিত্তেরও সামর্থ্যরে বাইরে চলে যাবে দাম।
এদিকে ফল না খেলে অপুষ্টির শিকার হবে শিশুরা। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. সায়েদুল আরেফিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফল মানুষের শরীরের পুষ্টি সমৃদ্ধ ও খনিজ পদার্থের জোগান দিয়ে থাকে। নিয়মিত এসব ফল না খেলে দেশে পুষ্টিহীনতা দেখা দেবে। তাতে মানুষের গ্রোথ কমতে থাকবে।
তিনি বলেন, এমনিতেই দেশের বেশিরভাগ শিশু পুষ্টি ঘাতটি নিয়ে বেড়ে উঠছে। তার ওপর ফলের দাম বাড়ার জন্য শিশুরা যথাযথ পুষ্টির জোগান না পেলে শিশুর বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ কমে আসবে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ রোগে আক্রান্ত হবে। সব মিলিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খুব দুর্বলভাবে বেড়ে উঠবে।