‘পরিবারতন্ত্রে’ ঠাঁই নেই ত্যাগীদের

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি বেশ জোরালো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাবার পরিচয়ে সন্তানরা রাজনীতিতে ঠাঁই পেয়েছেন, হয়েছেন এমপি, মন্ত্রী। ঠিক তেননি একই স্টাইলেই আবর্তিত হচ্ছে বিএনপির পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি। তৃণমূল থেকে নানা ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা মেধাবী ও ত্যাগীরা রাজনীতির ক্ষমতায় পিছিয়ে যাচ্ছে উত্তরাধিকার সূত্রে বসানো নেতৃত্বের কারণে। এতে ত্যাগী ও মেধাবী নেতারা ক্রমশ হতাশ ও রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও প্রবীণ রাজনীতিকরা।

চট্টগ্রামে আওয়ামী রাজনীতির চার কা-ারি হিসেবে পরিচিত ছিলেন আতাউর রহমান খান কায়সার, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এদের মধ্যে কেউ ছিলেন মন্ত্রী, কেউ এমপি আর কেউ মেয়র। তাদের অনুসারীদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের মেধা, শ্রম ও অর্থ দিয়ে দলে ক্রমশ নিজেদের যোগ্যতার আসনে নিয়ে গেছেন। কিন্তু এই কা-ারিদের অবর্তমানে তাদের সন্তানদের কপালেই জুটেছিল দলের মন্ত্রী-এমপির তকমা। আতাউর রহমান কায়সারের কন্যা ওয়াসিকা কায়সার তৃণমূলে রাজনীতি না করেও হয়েছেন মন্ত্রী ও এমপি। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদও একইভাবে একাধিক মেয়াদে মন্ত্রী-এমপির পতাকা উড়িয়েছেন। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরীও এমপি-হাফ মন্ত্রী ও ফুল মন্ত্রী হিসেবে পতাকা উড়িয়েছেন কয়েকবার। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ছেলে মাহবুবুর রহমান রুহেলও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিতার আসন থেকে দলীয় মনোনয়নে এমপি হয়েছিলেন।

এদিকে, ঠিক আওয়ামী স্টাইলেই ত্যাগী রাজনীতিকদের বাদ দিয়ে পারিবারিক উত্তরাধিকারীর পথে আবর্তিত হচ্ছে বিএনপির ক্ষমতার রাজনীতি। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ছেলে মীর হেলাল অল্প সময়ের মধ্যেই চট্টগ্রামে দলীয় রাজনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। পেয়েছেন কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ। চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে তার প্রভাব এখন আলোচিত বিষয়। আগামী সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৫ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তার নামই রয়েছে আলোচনার শীর্ষে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সমান প্রভাবশালী রাজনীতিক দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বিএনপি নেতৃত্বের মধ্যে এই মুহূর্তে অপ্রতিদ্বন্দ্বী তিনি। বিএনপি থেকে ইতিপূর্বে একাধিকবার এমপি ও মন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড রয়েছে তার। আগামী সংসদ নির্বাচনে তার ছেলে ও দলের পররাষ্ট্র উপ-কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে চট্টগ্রাম মহানগরীর যে কোনো একটি আসন থেকে প্রার্থী করা হতে পারে বলে আলোচনায় রয়েছে।

সাবেক মন্ত্রী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান চট্টগ্রামের প্রবীণ রাজনীতিক আবদুল্লাহ আল নোমান। মহানগরীর কোতোয়ালি ও ডবলমুরিং আসন থেকে একাধিকবার  দলের প্রার্থী হিসেবে নির্র্বাচন করেছেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে মাঝখানে বেশ কিছুদিন রাজনৈতিক কর্মকা-ে নিষ্ক্রিয় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে তাকে। তার পুরনো অনুসারীদের মধ্যে অনেকে ছেড়ে গেলেও একটি অংশ এখনো তাকে সামনে রেখে দলীয় রাজনীতিতে সামনে এগোতে চায়। আগামী সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (ডবলমুরিং) আসনে নিজে মনোনয়ন না নিয়ে ছেলে সাঈদ আল নোমানকে প্রার্থী করা হতে পারে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।

ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের ক্ষমতার বাইরে রেখে পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী নির্বাচনের এই প্রবণতা দলের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক বর্ষীয়ান রাজনীতিক জাহাঙ্গীর আলম। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মীর একটি লক্ষ্য থাকে। রাজনীতিতে নানা ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলে সে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু যখন সে দেখে, যোগ্যতার বিবেচনায় যখন তার দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার কথা সেখানে তার জায়গায় চলে আসছে প্রভাবশালী নেতাদের রাজনীতির বাইরে থাকা পুত্র-কন্যারা, মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছে। তখন তারা চরমভাবে হতাশ হয়। এর ফলে অনেক মেধাবী নেতা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। যা দলের জন্য ক্ষতিক্ষর।

চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বংশপরম্পরার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রবণতার কারণে প্রকৃত ও পরীক্ষিত রাজনীতিকদের অবমূল্যায়ন করা হয়। দীর্ঘদিন রাজনীতির পর একটি পর্যায়ে আসার পর তাদের পাওয়ার পলিটিক্সের জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে রেখে নেতাদের পারিবারিক উত্তারাধিকারীকে সেখানে জায়গা দেওয়া হয়। তারাই মন্ত্রী-এমপির পতাকা ওড়ানোর সুযোগ পান। আর ত্যাগী নেতাদের সান্ত¡না পুরস্কার হিসেবে দলীয় কোনো পদ দিয়ে খুশি করার চেষ্টা হয়। এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে ত্যাগী রাজনীতিকদের মধ্যে রাজনীতিবিমুখতা চলে আসছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য দলের তৃণমূল কিংবা জনগণ থেকেই আওয়াজ তুলতে হবে।