পাঠ্যপুস্তকে ‘আদিবাসী’ শব্দ সংবলিত গ্রাফিতি রাখা ও না রাখা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক দুই সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৩ জন আহত হয়েছে। এতে এক আদিবাসী সাংবাদিকও আহত হয়েছেন। নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে আদিবাসী শব্দটি বাদ দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’। ওই চিত্রকর্মে একটি গাছের পাঁচটি পাতায় লেখা ছিল মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও আদিবাসী; পাশে লেখা ছিল ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’।
সভারেন্টির দাবির মুখে গত রবিবার রাতে অনলাইন থেকে শব্দটি সরিয়ে নেয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃপক্ষ। এরপর আদিবাসী শব্দটি পুনর্বহালের দাবিতে ‘সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’ সংগঠন আন্দোলন শুরু করে। হামলা নিয়ে দুই গ্রুপই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে। তবে এ ঘটনায় এখনো কোনো পক্ষই থানায় অভিযোগ দেয়নি।
স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি সংগঠনের পাঁচটি দাবি আদায় না হওয়ায় ১২ জানুয়ারি কর্মসূচি থেকে রাজধানীর মতিঝিলে এনসিটিবি ভবন ঘেরাও কর্মসূচি দেয় সংগঠনটি। এর একদিন পর ১৩ জানুয়ারি একই কর্মসূচি ঘোষণা করে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মতিঝিলের এনসিটিবি ভবন এলাকায় অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি পালন করছিলেন তারা। এদিকে রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ শেষে এনসিটিবি ভবন ঘেরাও করতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দুই পক্ষ।
সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা সংগঠনের আহতরা হলেন অনন্ত বিকাশ ধামায়, ধন জেত্রা, জুয়েল মারাক, রূপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা, টনি ম্যাথিউ চিরান, ইসাবা শুহরাত, ফুটন্ত চাকমা, দনওয়াই ম্রো, রেং ইয়ং ম্রো, স্নেহলাল তঞ্চঙ্গ্যা, শান্তা চাকমা, সুস্মী চাকমা, এনজেল চাকমা, সুশান্ত চাকমা, মিশেল ত্রিপুরা, মলয় বিকাশ ত্রিপুরা, রাহি নায়াব ও ববি বিশ্বাস। এদিকে স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির আরিফুল খবির, শওকত, আব্বাস, রাজন হোসেন, ওয়াফী, মনোয়ার, নুহান, জিহাদ ও সজিবসহ ১৬ জন আহত হয়েছেন।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ায় সকাল থেকে এনসিটিবি ভবনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। দুপুর ১টার দিকে হঠাৎ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দুই গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এখানে দায়িত্ব পালনরত একাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতার মিছিল মতিঝিল সিটি সেন্টারের মুখে পৌঁছালে তাদের গতিরোধ করার চেষ্টা করেন স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির সদস্যরা। তারপরও বাধা উপেক্ষা করে এনসিটিবি ভবনের সামনে আসার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বেধে যায়।
এ বিষয়ে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শাহরিয়ার আলী বলেন, এনসিটিবি ভবনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। দুপক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে আসার আগেই তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সক্রিয় ছিল। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কোনো দায়িত্বে অবহেলা নেই।
প্রত্যক্ষদর্শী খায়রুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ করে কোথা থেকে যে কারা এলো বুঝে উঠতে পারেনি। একটু পর দেখি পুলিশ দুপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর দুপক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি সেøাগান দিচ্ছে। এর মধ্যে একটি দল লাঠিসোঁটা নিয়ে আদিবাসীদের হামলা চালিয়ে বসে। এতে তারা দিগবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। এরপর ঘটনাস্থলে কিছু সময় একটি গ্রুপ মিছিল করে।
স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টির আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক জিয়া বলেন, আমাদের কর্মসূচি পূর্বনির্ধারিত ছিল। গতকাল (মঙ্গলবার) রাতে আমরা তাদের কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে পারি। আমরা শুরুতে চেয়েছিলাম আমাদের কর্মসূচি পেছাতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। এনসিটিবির সামনে আমাদের কর্মসূচি বেলা ১১টায় ছিল। উপজাতি শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিও একই সময়ে টিএসসিতে ছিল। তারা সমাবেশ শেষে এনসিটিবিতে যাবেন সেটা আমরা পরে জানতে পারি। এ কারণে আমরা আমাদের কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করেছি। আমাদের কর্মসূচি চলাকালে এনসিটিবি আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ডাকে। আমাদের একটা প্রতিনিধিদল তাদের সঙ্গে কথা বলতে যাই। কথা শেষ করে কর্মসূচি স্থলে আসার পর আমরা পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি যে, তারা আসছেন। আমরা অল্প সময়ের মধ্যে কর্মসূচি শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই তারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে আমাদের ওপর হামলা করে। এতে আমাদের ১৬ জন আহত হয়েছেন।
স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টির কর্মী সাকিব বলেন, এ ঘটনা সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। আদিবাসী ছাত্র ফোরামের সভাপতি অলিক মৃ’র নেতৃত্বে আমাদের ওপর কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই হামলা করা হয়। আমরা এনসিটিবির সামনে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিলাম। তারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে আমাদের ওপর হামলা করে।
আদিবাসী ছাত্র ফোরামের সভাপতি অলিক মৃ বলেন, আমরা কোনো ধরনের হামলা করিনি। আমরা শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে সেখানে যাই। তখন তারাই আমাদের ওপর হামলা করে। এরপর আমরা সেখানে বসে পড়ি। তখন আবারও তারা হামলা করে আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে আমাদের ১৭ জন আহত হন। গুরুতর আহত হন সাতজন।
স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুহম্মদ মুহিউদ্দীন রাহাত বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা বিদেশি প্ররোচনায় ২০০৭ সাল থেকে নিজেদের আদিবাসী দাবি করলেও তারা তা নয়। তারা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে আমাদের ভূখ-ে বাঙালিদের সঙ্গে সহাবস্থান করছে। আদিবাসী বলতে বোঝায় আদি বাসিন্দা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদি নিবাস হচ্ছে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার, ভারত, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলোয়।
২০০৭ সালে জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসীবিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়, ওই ঘোষণাপত্রে এমন কিছু বিতর্কিত অনুচ্ছেদ রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে আদিবাসী অঞ্চলের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও অখ-তা থাকে না। দেশে কোনো উপজাতীয় আদিবাসী না থাকায় বাংলাদেশ ওই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেনি। ওই ঘোষণাপত্রের একটি অনুচ্ছেদে আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও আরেকটি অনুচ্ছেদে স্বায়ত্তশাসন ও নিজস্ব সরকার গঠনের অধিকার দেওয়া হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখ-তার জন্য হুমকি হওয়ায় সংবিধানবিরোধী ওই শব্দ পাঠ্যবই থেকে বাতিলের দাবি জানানো হয়।
আদিবাসীদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা : মতিঝিলে এনসিটিবি ভবনের সামনে বিভিন্ন জাতিসত্তার নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটি। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এবং ইউপিডিএফের নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদও হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি বলেও অভিযোগ করা হয়। বুধবার এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদ পাঠানো হয়।
জাতীয় নাগরিক কমিটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের এক পোস্টে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যাসহ আরও অনেকেই আহত হয়েছেন। আমরা এ হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরব ভূমিকা পালন করলে এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলা দেখতে পেতাম না। ভিডিও ফুটেজ তদন্ত করে এ হামলার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।