দেশে নতুন করে দেখা দেওয়া এইচএমপিভি (হিউম্যান মেটানিউমো ভাইরাস) আক্রান্ত নারী মারা গেছেন। গত বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার নাম সানজিদা আক্তার, বয়স ৩০ বছর। তিনি নরসিংদীর বাসিন্দা ছিলেন। দেশে এটাই এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগীর প্রথম মৃত্যু।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ করার শর্তে প্রথম এই মৃত্যুর তথ্য জানান। পরে বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর তথ্য ও কারণ ব্যাখ্যা করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। ওই নারী গত শুক্রবার থেকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেন, এইচএমপিভি আক্রান্ত রোগীর অন্যান্য রোগ ছিল। তিনি এইচএমপিভি থেকে সুস্থ হয়ে গেলেও অন্যান্য রোগে তার মৃত্যু হয়। তিনি খুব মোটা ছিলেন। তার কিডনিসহ অন্যান্য জটিলতা ছিল।
পরে সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান এই নারী চিকিৎসার একপর্যায়ে নিউমোনিয়া ও মাল্টি অর্গান ফেইলিউরের কারণে মারা যান বলে জানান। তিনি বলেন, সানজিদা আক্তার নামের ভদ্রমহিলা এক মাসের অধিক সময় ধরে অসুস্থ ছিলেন। তিনি বাসার আশপাশেই চিকিৎসা নেন। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি হন। এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুসারে বলা যায়, এইচএমপিভি ভাইরাসের কারণে মৃত্যুর ঘটনা খুবই বিরল। তিনি ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন ও পরে তার মাল্টি অর্গান ফেইলিউর হয়। এ ছাড়া ওনার অতি স্থূলতা বা অবিসিটি, থাইরয়েড ডিসফাংশন ছিল। চিকিৎসার একপর্যায়ে নিউমোনিয়া ও মাল্টি অর্গান ফেইলিউরের কারণে রোগীর মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে রোগী এইচএমপিভি ভাইরাসেও আক্রান্ত ছিলেন।
সানজিদার মৃত্যুতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন বিশেষ সহকারী।
এর আগে গত রবিবার ১২ জানুয়ারি দেশে নতুন করে প্রথম এইচএমপিভি শনাক্তের তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আক্রান্তের পর এই নারীকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি সেখানেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এইচএমপিভির পাশাপাশি তিনি আর একটি নিউমোনিয়াজনিত ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং অন্যান্য রোগের কারণে তাকে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তার বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস ছিল না।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ : সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, এই ভাইরাসে সাধারণত মৃত্যু ঘটে না। কোথাও মৃত্যু ঘটছেও না। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলোর স্বাস্থ্যবিষয়ক কিছু গাইডলাইন আছে। এখন এ সময় যদি কেউ ফ্লুতে আক্রান্ত হন, তিনি জনসম্মুখে আসবেন না ও জনসম্মুখে মাস্ক পরিধান করেন। কেউ যদি অসুস্থবোধ করেন, ঘরে থাকেন। এগুলো অন্যান্য দেশেও প্রচলিত আছে এবং এসব পরামর্শকে রেসúিরেটরি এটিকেট (শ্বাসতন্ত্রজনিত স্বাস্থ্যবিধি) বলা হয়।
মিউটেশনে প্রাণঘাতী হতে পারে : বিশেষ সহকারী আরও বলেন, সাধারণত সিজনাল ফ্লু যেগুলো হয়, এ ভাইরাসের লক্ষণ ঠিক তেমন। যেমন সর্দি, কাশি, শরীর ব্যথা ও নাক দিয়ে পানি পড়া। সাধারণ ফ্লুয়ের সঙ্গে এটার কোনো পার্থক্য নেই। এইচএমপিভি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ হেলথ এজেন্সিগুলো থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুরনো গাইডলাইন আছে যেখানে, সেখানেও কিছু কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো কোনোভাবে সতর্কতা বলা যাবে না। এই ভাইরাস অনেক আগে থেকেই আছে এবং সেটা প্রাণঘাতী না।
তবে এইচএমপিভিসহ যেকোনো ভাইরাস মিউটেশনের কারণে ক্ষতিকর বা প্রাণঘাতী হয়ে যেতে পারে বলে জানান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো ভাইরাসের যখন বিস্তার হতে থাকে, তখন সেটার প্রতিনিয়ত মিউটেশন বা পরিবর্তন হতে থাকে। মিউটেশনের কারণে যেকোনো ভাইরাসের সময় এটা ক্ষতিকর বা প্রাণঘাতী হয়ে যেতে পারে। তাই এটার বিস্তার রোধ করা জরুরি। এটা যত কম ছড়াবে, ততই বিস্তার রোধ করা সহজ হবে।
চিকিৎসার প্রস্তুতি আছে : এই বিশেষ সহকারী বলেন, ‘এই ভাইরাসে পাঁচ বছরের নিচে এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে শিশু এবং বয়স্কদের জন্য এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, অ্যাজমাসহ অন্যান্য রোগব্যাধি আছে, তাদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি আছে। এতে আক্রান্ত হলে অক্সিজেনের দরকার হতে পারে। আমাদের সেই প্রস্তুতি আছে। প্রয়োজনে কভিডকালীন প্রস্তুতি আবার পুনরুজ্জীবিত করব।’
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সবাইকে কোনোপ্রকার সতর্কতা নয়, পরামর্শ দিচ্ছি স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলেন। হাত ধোয়া, অসুস্থ থাকলে জনসম্মুখে কম আসা এবং ঘরে থাকা এগুলো মেনে চলুন। এখনো দূরত্ব বা ডিসটেনস বজায় রাখার কোনো পরামর্শ দিচ্ছি না। তবে কেউ যদি ফ্লুতে আক্রান্ত হন, তিনি যেন সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে কম আসেন। অসুস্থ হলে তিনি যেন ঘরে থাকেন।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর, আইসিডিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন উপস্থিত ছিলেন।
আগে থেকেই আছে এই ভাইরাস : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এইচএমপিভি মূলত একটি শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস, যা প্রধানত ফুসফুস ও শ্বাসনালি প্রভাবিত করে। বিশ্বে ভাইরাসটি ২০০১ সালে প্রথম শনাক্ত হয়। বাংলাদেশে ২০১৭ সাল থেকেই ভাইরাসটি পাওয়া যাচ্ছে। তবে এটি শ্বাসতন্ত্রজনিত সাধারণ ভাইরাস হওয়ায় অধিদপ্তর এই ভাইরাসের তথ্য প্রচার করছিল না। সম্প্রতি চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও পাশের দেশ ভারতের পর বাংলাদেশেও শনাক্ত হওয়ায় এটি নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।