মুসলিম নবজাগরণের অগ্রদূত

আল্লামা আবদুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.) ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। সমসাময়িক আলেমদের মধ্যে ছিলেন নিজ স্বাতন্ত্র্যে চিহ্নিত এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। ইসলামের এই অকুতোভয় বীর ১৯১৩ সালে সিলেটের জকিগঞ্জের ফুলতলী গ্রামে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সাথী শাহ কামালের (রহ.)-এর বংশধর তিনি। যদিও তার নাম আবদুল লতিফ ফুলতলী, তবে ভক্ত-মুরিদদের কাছে তিনি ‘সাহেব কেবলা’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।

আল্লামা ফুলতলী (রহ.) ছিলেন বর্ণাঢ্য ও গৌরবময় রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়াও জীবদ্দশায় তিনি অন্যায়-অবিচার, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলন ও সংগঠন পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র ইসলামি রাজনীতির প্রাণপুরুষ। মেধা ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে তিনি রাজনীতি করেছেন দেশ ও মানুষের জন্য। দেশ-জাতির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ তাকে নীরব দর্শকের ভূমিকায় বসে থাকতে দেয়নি। ফুলতলী (রহ.) ইমাম আবু হানিফার (রহ.)-এর স্বার্থক উত্তরসূরি হিসেবে একাধিকবার মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব নির্দ্বিধায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার কঠিন দায়িত্ব পালনে তিনি কখনো বিচলিত হননি। শত ব্যস্ততার মাঝেও যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন রাজপথের অগ্রগামী মুজাহিদ।

চল্লিশের দশকে উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরণের জোয়ার সৃষ্টি হয়। আল্লামা ফুলতলী (রহ.) সেখানেও প্রথম সাড়া দেওয়া ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। মুসলিম ভারতের যুগ সন্ধিক্ষণে ‘জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ’-এ যোগদানের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেন। উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যে কয়টি সংগঠন মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল ‘জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ’ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এ তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইন্ডিয়া ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফখর উদ্দিন আলী আহমদ, আসামের সাবেক মন্ত্রী আবদুল মোতালিব মজুমদার, হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.), অরুণ কুমার চন্দ, রবীন্দ্র আদিত্য, কামেনী সেন, বীরেন্দ্র বাবু, যতীন্দ্র মোহন দেব, সুধীর কুমারসহ সমকালীন অন্য নেতৃবর্গের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তা ছাড়া তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মাওলানা মুহাম্মদ আলী, শওকত আলী, মহাত্মা গান্ধী, সি. আর দাশ প্রমুখ নেতাদের সঙ্গে সভায় মিলিত হন। একপর্যায়ে তিনি ঘোষণা দিয়ে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ ত্যাগ করেন।

ফুলতলী (রহ.)-এর রাজনৈতিক আন্দোলন শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সুদূর বিদেশের মাটিতেও তার সুযোগ্য নেতৃত্বে মুসলমানদের সম্মান-ইজ্জত রক্ষা পেয়েছিল। ১৯৫০ সালের ঘটনা, একবার ভারতের আসাম প্রাদেশিক সরকার ‘মুসলিম এডুকেশন বোর্ড’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। তখনকার সময়ের আলেমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে সম্মত হলেও রাজপথে ভূমিকা নিতে কারও সাহস ছিল না। অবশেষে সবাই মিলে ফুলতলী (রহ.)-কে এ ব্যাপারে অনুরোধ করলে তিনি পরপর দুটি জনসভা করে প্রতিবাদ জানান। তার নেতৃত্বে আসামের নগাঁও জেলার ডবকা, লংকা ও মুরাঝার জনসভা করেন। প্রতিবাদ সভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তারপর পুলিশ তাকে খুঁজতে থাকে। এই সংকটময় অবস্থাতেও তার নেতৃত্বে আসাম প্রদেশে একটি নয়, দুটি নয় আরও বহু বহু প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হলে আসাম সরকারের নির্দেশে প্রশাসন তার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত দেখামাত্র গুলির অর্ডার দেয়। এতেও ফুলতলী (রহ.) দমে যাননি।

পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফুলতলী (রহ.) ‘নেজামে ইসলাম’-এ যোগদান করে ইসলামি রাজনীতিতে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময় তিনি এ সংগঠনের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ‘নেজামে ইসলাম’ ছিল ইসলামি রাজনীতির পূর্ব পাকিস্তানের সম্মুখ সারির সংগঠন। ফুলতলী (রহ.) চট্টগ্রামের মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ, ময়মনসিংহের মাওলানা আতহার আলী, ফরিদপুরে মাওলানা শামছুল হক এবং টাঙ্গাইলের মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানীর সমসাময়িক ছিলেন। সত্তর দশকের শেষদিকে তিনি সকল ভ্রান্ত মতবাদ থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামা-মাশায়েখদের সমন্বয়ে গণসংগঠন ‘বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহ’ গঠন করেন। ব্যক্তি ও সমাজ সংশোধনের পাশাপাশি দেশ-জাতির ক্রান্তিলগ্নে এ সংগঠন জোরালো ভূমিকা পালন করে থাকে। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ধর্মের বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে সংগঠনটির ভূমিকা অতি উজ্জ্বল। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বাবরি মসজিদ ভেঙে রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদ, সভ্যতার চারণভূমি ফিলিস্তিনের অসহায় মুসলমানসহ কাশ্মীর, তাজাকিস্তান, সিরিয়া, বার্মা, আফগানিস্তান ও ভারতের মুসলমানদের পক্ষে আন্দোলন, শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে বোমা বিস্ফোরণের প্রতিবাদ, স্বতন্ত্র আরবি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঐতিহাসিক লংমার্চসহ ধর্মীয় ও জাতীয় যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে সংগঠনটি আপসহীন ভূমিকা পালন করে আসছে।

আল্লামা ফুলতলী (রহ.) ২০০৮ সালের ১৫ জানুয়ারি দিবাগত রাত ২টায় সিলেট শহরের সুবহানীঘাটস্থ তার বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।