যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধে দীর্ঘ স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সমর্থন না পেলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর অগ্রগতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
‘বিশ্ব প্রতিবেদন-২০২৫’ শীর্ষক ৫৪৬ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ১০০টির বেশি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক তিরানা হাসান প্রতিবেদনটির সূচনা প্রবন্ধে লিখেছেন, গত বছর বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সরকার রাজনৈতিক বিরোধী, কর্মী ও সাংবাদিকদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ করেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনী বেআইনিভাবে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে। অনেককে তাদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করেছে এবং মানবিক সহায়তা পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
সূচনা প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে ৭০টির বেশি দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব দেশের বেশির ভাগেই কর্তৃত্ববাদী নেতারা তাদের বৈষম্যমূলক বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে ও নীতির কথা বলে নিজেদের অবস্থানকে সংহত করেছেন।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বলা হয়ে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার গুমের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে একটি কমিশন গঠন করেছে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে তিন সপ্তাহব্যাপী ছাত্র আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হন।
মানবাধিকার সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার-সম্মত ভবিষ্যতের দিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এই অগ্রগতি স্থায়ী নাও হতে পারে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গুমের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নাগরিক তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠা অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
এতে বাংলাদেশের মানবাধিকার ইস্যুতে কয়েকটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও তাদের আইনি অধিকার ও সঠিক বিচার প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ, বেআইনিভাবে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি বা তাদের পরিবারের কাছে তথ্য সরবরাহ করতে নিরাপত্তাবাহিনীর ব্যর্থতা এবং মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
এইচআরডব্লিউ অন্তর্বর্তী সরকারকে মানবাধিকার মান অনুযায়ী সংস্থাগুলোকে সংস্কার করার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বাতিল করা, নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য স্বাধীন তত্ত্বাবধান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার সঙ্গে কাজ করা।