চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সোনা পাচার নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় সময় কাঁড়ি কাঁড়ি সোনাসহ ধরা পড়ছেন ‘মিডলম্যান’। সঠিক ঠিকানায় ‘চালান’ পৌঁছে দেওয়াই তাদের কাজ। কিন্তু ‘ধৃতদের’ জেরা করেও ‘মাথাদের’ ছুঁতে পারে না পুলিশ। চট্টগ্রামে ১০ কোটি টাকার ১৮ কেজি সোনা উদ্ধার মামলার তদন্তে গিয়ে সেই ‘মাথার’ বা রাঘব বোয়ালের হদিস দিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা শাখা।
২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর সকাল ১০টায় দুবাই থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট (বিজি-১৪৮)। এই উড়োজাহাজের তিনটি সিটের নিচে (৩৩ বি, ১৯ বি, ১৪ বি) পরিত্যক্ত অবস্থায় ১৮ কেজি ৫৬০ গ্রাম ওজনের ১৬০টি সোনার বার উদ্ধার করেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
ঘটনার চার দিন পর ১৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থানায় অজ্ঞাতনামা সোনা চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করেন বিমানবন্দরে নিয়োজিত কাস্টমসের তৎকালীন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা উক্যওয়ান মার্মা। এক সপ্তাহ ওই মামলা তদন্ত করেন পতেঙ্গা থানার উপপরিদর্শক মো. মহিউদ্দিন রাজু। ২৭ অক্টোবর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিআইডি, চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা শাখা। পর্যায়ক্রমে সিআইডির চারজন পরিদর্শক চার বছর ধরে চাঞ্চল্যকর এই মামলা তদন্ত করেন। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হলেন ইন্সপেক্টর সুমন সাহা। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তিনি।
ইন্সপেক্টর সুমন সাহা জানান, তদন্তে ১৮ কেজি সোনা চোরাচালানের মূল হোতা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মো. আবু সাহেদ ওরফে গিয়াস ওরফে এম এ সাহেদসহ (৩০) সাতজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এই সাহেদ ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগর ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামের আবিদ উল্লাহ উকিল বাড়ির আবু তাহেরের ছেলে। বাকি ছয়জন হলেন ফেনী জেলার ছাগলনাইয়ার উত্তর বাতাবনিয়া গ্রামের মৃত আবদুর রহমানের ছেলে আবুল হোসেন (৪৭), কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানাধীন উত্তর লক্ষ্যার চর গ্রামের জহির আহমদের ছেলে মোহাম্মদ রুবেল (৩৬), চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার জাফতনগর ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের মৃত শামসুল আলমের ছেলে হেলাল উদ্দিন (৩৭), একই গ্রামের কোরবান আলী পণ্ডিত বাড়ির মৃত ছগির আহমদের ছেলে মো. আলী ওরফে পিয়ারু (৩৮), একই বাড়ির আহমদ হোসেনের ছেলে মো. সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বাপ্পু (৩১) এবং চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন শুলকবহর এলাকার করিম উদ্দিনের ছেলে মো. রেজাউল করিম সিদ্দিক (৪৯)। ওই সাতজনের মধ্যে মূল হোতা এমএ সাহেদ কয়েক মাস আগে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক সুমন সাহা।
সিআইডির এই কর্মকর্তা জানান, উড়োজাহাজের যে তিনটি সিটের নিচ থেকে ১৬০ পিস সোনার বার উদ্ধার করা হয় সেসব সিটের যাত্রীদের তথ্য সংগ্রহ করে সিআইডি। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ঘটনার দিন (১৫ অক্টোবর, ২০২০) সকাল সাড়ে ৮টায় বিমান এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের (বিজি-১৪৮) ওই তিনটি সিটের যাত্রী ছিলেন মো. রেজাউল করিম সিদ্দিক, মো. আবুল হোসেন এবং মোহাম্মদ রুবেল। প্রথমে আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। পরে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় মোহম্মদ রুবেলকে। তাকে (রুবেল) রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় মো. হেলাল উদ্দিনকে। এই হেলাল ১৬০ পিস সোনার বার চোরাচালানে জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হোসেন মোহাম্মদ রেজার আদালতে ১৬৪ ধারার জবাববন্দি দেন।
তারই (হেলাল) জবাববন্দিতে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ১৬০ পিস সোনার বার চোরাচালানে মো. আলী ও মো. সাজ্জাদ হোসেন নামের আরও দুজন জড়িত বলে আদালতকে জানান হেলাল। দুজন তখন নগরের কোতোয়ালি থানায় দায়ের হওয়া অন্য একটি চোরাচালান মামলায় কারাবন্দি ছিলেন। সাজ্জাদ ও মো. আলী দুজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। জিজ্ঞাসাবাদে মো. রেজাউল করিম সিদ্দিকের নাম উঠে আসে। তদন্তকারী কর্মকর্তা সুমন সাহা জানান, আসামি হেলাল উদ্দিনের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ১৬০ পিস সোনার বার চোরাচালানের মুলহোতা হিসেবে উঠে আসে ফটিকছড়ির এম এ আবু সাহেদের নাম। আসামি হেলালের জবানবন্দিতে উঠে আসা এমএ সাহেদ অন্য একটি চোরাচালান মামলায় জেলহাজতে আছেন। আদালতের আদেশে পতেঙ্গা থানার এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় এমএ সাহেদকে।
ঘটনার দিন ৪০ পিস সোনার বার বিমানের ওই ফ্লাইটের ১৯বি সিটের নিচে লুকিয়ে আনার কথা ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে স্বীকার করেন হেলাল। একই উড়োজাহাজের ৩৩ এ,২৯বি এবং ১৪ই সিটের নিচে লুকিয়ে রুবেল, আবুল হোসেন ও রেজাউল করিম বাকি ১২০ পিস সোনার বার আনার কথা আদালততে জানান হেলাল। সূত্রটি জানায়, হেলাল নিজের পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাই থেকে ৪.৮ কেজি ওজনের ৪০টি সোনার বার কেনেন। মূলত এসব সোনার বারের মালিক এমএ সাহেদ। ঘটনার দিন (১৫ অক্টোবর ২০২০) দুবাই থেকে বিমানের ওই ফ্লাইটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে আসা রুবেল, রেজাউল করিম, হেলাল ও আবুল হোসেনকে ১৬০ পিস সোনার বার সরবরাহ করেন চোরাকারবারি এমএ সাহেদ ওরফে আবু সাহেদ।
সিআইডির ইন্সপেক্টর সুমন সাহা বলেন, ‘আবু সাহেদ সোনা চোরাচালানে জড়িত। দুবাই বসে সাধারণ যাত্রী বা বাহকদের মাধ্যমে দেশে কোটি কোটি টাকার সোনা পাচারে জড়িত। আসামি হেলালের আগে একাধিক বার সাহেদের সরবরাহ করা সোনার বারের চালান দেশে এনেছেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। সাহেদই ৯ কোটি ৬০ লাখ ৬৭ হাজার ৮৯৬ টাকা মূল্যের ১৬০ পিস সোনার বার চালানের মূল হোতা। গ্রেপ্তার হওয়া আলী ও সাজ্জাদের দায়িত্ব ছিল সাহেদের হয়ে শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে সোনার চালান রিসিভ করে পরে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।
এই প্রসঙ্গে সিআইডি চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার শাহনেওয়াজ খালেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোনা পাচারের ঘটনায় শুধু বাহকরাই ধরা পড়ে। ধৃতদের দফায় দফায় জেরা করেও চোরাকারবারির ‘মাথা’র হদিস পাওয়া যায় না। কিন্তু ১৮ কেজি সোনা পাচারের মামলা তদন্তে গিয়ে সেই রাঘব বোয়াল কিংবা ‘মাথার’ হদিস পেল সিআইডি। এটি আমাদের বড় সাফল্য।’