মুঘলরা ভারতীয় উপমহাদেশে তিনশ বছরের অধিক রাজত্ব করেছে। দীর্ঘ এ সময়ে মুঘল শিল্পের সংমিশ্রণ ঘটেছে ভারতীয় শিল্পে। বিশেষ করে মুঘলরা এই অঞ্চলের স্থাপত্যশিল্পকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। তাদের নির্মিত স্মৃতিসৌধ, মসজিদ, দুর্গ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুগ্ধকর স্থাপত্যশৈলীর এসব নিদর্শন ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে দেখতে পাওয়া যায়। সেসব স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা শাহি মসজিদ। ৩০০ বছরের পুরনো দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি বজরা ইউনিয়নে অবস্থিত।
১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে মুঘল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের রাজত্বকালে বজরার জায়গিরদার পারস্য দেশীয় পীর মিয়া আম্বর শাহের নির্দেশে আমানুল্লাহ ও ছানাউল্লাহ ৩০ একর জমিতে দীঘি খনন করে তার পাশেই নান্দনিক এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৯১১ থেকে ১৯২৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে বজরা জমিদার খান বাহাদুর আলী আহমদ ও খান বাহাদুর মুজির উদ্দিন আহমদ মসজিদটি ব্যাপকভাবে মেরামত করেছিলেন এবং সিরামিকের মোজাইক দিয়ে সজ্জিত করেছিলেন। নোয়াখালীসহ সমগ্র বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারে রয়েছে এই মসজিদের বিশেষ অবদান।
২৯ নভেম্বর ১৯৯৮ থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বজরা শাহি মসজিদের ঐতিহ্য রক্ষা এবং এর দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য কাজ করছে। আমাদের দেশের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এ মসজিদে এলেই নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী দেখে দর্শনার্থীদের মন জুড়িয়ে যায়।
বজরা শাহি মসজিদে ঢোকার পথ মোজাইক দিয়ে সজ্জিত করা। মসজিদের পূর্ব দিকে তিনটি দরজা রয়েছে, প্রতিটির ওপর অর্ধগম্বুজাকৃতির সরু মিনার রয়েছে। দরজা বরাবর রয়েছে কিবলা দেয়াল। যার অভ্যন্তরে রয়েছে তিনটি মেহরাব। যা অত্যন্ত কারুকার্যময়। মাঝের মেহরাবটি অন্য দুটির তুলনায় অপেক্ষাকৃত বড়। মসজিদের মাঝের দরজায় একটি ফলকে ফারসি ভাষায় এর নির্মাণকাল ও নির্মাতার নাম লেখা রয়েছে। স্থাপনাটির চার কোণে চারটি সুন্দর মিনার রয়েছে, যা এর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদের পূর্বদিকে আছে বিরাট তোরণ। তোরণের দোতলার ওপরে রয়েছে মনোরম উঁচু মিনার। এর সৌন্দর্য ও অলংকরণের জন্য চীন দেশীয় গ্লাস কেটে মসজিদের গায়ে লাগানো হয়। যা এখনো নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী হিসেবে বিরাজমান। মসজিদের অভ্যন্তরীণ দুটি কক্ষ আছে, যা বহুখাঁজবিশিষ্ট আড়াআড়ি খিলান দ্বারা তিনভাগে বিভক্ত। ছাদের ওপর তিনটি কন্দাকৃতির গম্বুজ আছে, যা অষ্টকোনাকার। এগুলোর শীর্ষ পদ্ম ও কলস চূড়া দ্বারা সজ্জিত।
মসজিদটি নোয়াখালীর মাইজদী শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা নামক স্থানে প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। নোয়াখালী জেলা সদর মাইজদী থেকে সোনাইমুড়ীগামী যেকোনো বাস, সিএনজি বা অটোরিকশাযোগে বজরা হাসপাতালের সম্মুখে নেমে রিকশা বা পায়ে হেঁটে ২০০ গজ পশ্চিমে গেলে বজরা শাহি মসজিদে পৌঁছা যাবে।