রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা নেই অনেক বছর ধরেই। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অনেক আগে চালু হয়েছিল বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্প। তবে নানা কারণে আলোর মুখ দেখেনি এটি। আগামী মাসে নতুন করে ছয়টি রুটে চালু হতে যাচ্ছে বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের প্রকল্প। কিন্তু মনিটরিংয়ের প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় প্রকল্পের সুফল পাওয়া যাবে কি না প্রশ্ন করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকায় বাস চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে ২০১৮ সালের নভেম্বরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে সভাপতি করে ‘বাস রুট র্যাশনালাইজেশন কমিটি’ করা হয়। বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ৪২টি রুটের ২২টি কোম্পানির বাস ৯টি ভিন্ন রঙে চালানোর প্রস্তাব দেয় ডিটিসিএ (ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি)। অংশীজনদের নিয়ে কয়েক দফা সভা করার পর ২০২১ সালে তিনটি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ৫০টি বাস নিয়ে চালু হয় ‘ঢাকা নগর পরিবহন’। কিন্তু সেটি সফল হয়নি। গত ৫ আগস্টের পর ‘বাস রুট র্যাশনালাইজেশন কমিটি’ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির কাজ পুরোদমে শুরু করেছে।
জানা গেছে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার সব বাস চলবে একটি কোম্পানির আওতায়। নির্দিষ্ট রুট ধরে চলবে বাসগুলো। ইতিমধ্যে ২৫০টির বেশি কোম্পানি আবেদন করেছে। এখন আবেদনগুলোর বাছাইয়ের কাজ চলছে। ছয়টি রুটে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি বাসগুলোর যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ৪২টি রুট চালু করার পরিকল্পনা আছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘সিটির গণপরিবহনের যে সমস্যা, তার সমাধানের জন্য বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের উদ্যোগটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে অনেক সমস্যা সমাধান হতো। কিন্তু কয়েক দফায় প্রকল্পটি পেছানো হয়েছে। এ কারণে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যায়নি।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘এত বড় একটি প্রকল্প করা হচ্ছে অথচ সেখানে যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব নেই। আমলাতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে প্রকল্পটি চালু হতে যাচ্ছে। প্রকল্পের অনেক কিছুই স্পষ্ট নয়। ফলে আগের মতোই এটি হোঁচট খেতে পারে।’
প্রকল্পটি চালু করলেও যাত্রীদের উপকার হবে না উল্লেখ করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ‘কারণ, রাজধানীর গণপরিবহনের বেহাল দশা। অনেকেই উঠতে চায় না এসব লক্কড়ঝক্কড় বাসে। তাই সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেশি। সেজন্য বাস রুট র্যাশনালাইজেশন চালু করা হলে নতুন বাস নামানো উচিত।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে কমিটি ধরে করা হচ্ছে, সে কমিটি তো আর এটা দেখভাল করবে না। এটার জন্য যারা সফল হতে চায়, তারা আগের কমিটি যে উদ্যোগগুলোর জন্য সফল হয়নি, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে পারত। কিন্তু তা করা হয়নি। তারা নিজেরা নিজেরা আবার একই পদ্ধতিতে প্রকল্পটি চালু করতে যাচ্ছে। মনে রাখা দরকার, গণপরিবহন একটি বিশেষায়িত সেবা। এ সেবা কোনো না কোনো একটা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালনার করতে হয়। সেটি এখানে হয়নি। তাই আমি মনে করছি, ভুল পথেই আছে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত গণপরিবহনের পরিচর্যা করতে হয়। গণপরিবহনকে লালন করতে হয়। কিছু ধার করা লোক নিয়ে একটা উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটি একটি উদ্যোগ হতে পারে কিন্তু সফল উদ্যোগ হতে পারে না। আগের সরকার তাদের ইচ্ছামতো কাজ করত। এজন্য তখন প্রকল্পটি সফল হয়নি। শুধু মিটিং করে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা যাবে না। বর্তমান সরকারের দারুণ সুযোগ ছিল গণপরিবহনকে ঢেলে সাজানোর। সুন্দর পরিকল্পনা ভালোভাবে বাস্তবায়ন না করলে হতাশজনক ফলই আসবে।’
বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রকল্পের পরিচালক ধ্রুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন করতে। আগামী ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখে প্রাথমিকভাবে ছয়টি রুট দিয়ে যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৫০টির বেশি বাস কোম্পানি আবেদন করেছে। প্রকল্পটি পুরোদমে চালু হলে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরবে।’