ভ্যাট বাড়ানোর দুই সপ্তাহের মধ্যে কিছু পণ্যসেবায় ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক কমাল এনবিআর। এ তালিকায় রয়েছে মোবাইল ফোন সেবা, রেস্তোরাঁ, নিজস্ব ব্র্যান্ডের পোশাক, মিষ্টি, নন-এসি হোটেল, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে ভ্যাট বাড়ানোর দুই সপ্তাহের মধ্যে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে পিছু হঠল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
ওষুধ, রেস্তোরাঁ ও মোবাইল ফোনসহ বেশ কিছু পণ্য ও সেবার ওপর আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কমিয়ে গতকাল বুধবার চারটি প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তারা জানিয়েছে, সব জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসাসেবাকে আরও সহজতর করার লক্ষ্যে ওষুধ শিল্পের ওপর ব্যবসায়িক পর্যায়ে বাড়ানো ভ্যাটের হার সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে আগের মতোই ২ দশমিক ৪ শতাংশ রাখা হয়েছে। এনবিআর আশা করছে, ওষুধের ওপর অতিরিক্ত আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করায় ওষুধ শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ বজায় থাকবে এবং সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে ওষুধের দাম বাড়বে না।
এনবিআর বলছে, দেশের চলমান ডিজিটাইজেশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও আধুনিক আইটি জ্ঞানসম্পন্ন তরুণ প্রজন্ম বিনির্মাণ এবং অনলাইনভিত্তিক কর্মকা- বৃদ্ধির লক্ষ্যে মোবাইল ফোনের সিম/রিম কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে প্রদত্ত সেবার ওপর বর্ধিত সম্পূরক শুল্ক এবং আইএসপি সেবার ওপর নতুন আরোপিত সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। মোবাইল ফোন এবং আইএসপি সেবার ওপর বর্ধিত/নতুন আরোপিত সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করায় এ দুই খাতে ভোক্তাদের খরচ বৃদ্ধি পাবে না।
দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য সুলভমূল্যে রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণের সুবিধার্থে থ্রি, ফোর ও ফাইভ স্টার হোটেল ছাড়া অন্য সব রেস্তোরাঁয় অতিরিক্ত আরোপিত ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অতিরিক্ত আরোপিত ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ফলে সাধারণ জনগণ আগের মূল্যেই এসব রেস্তোরাঁর খাবার গ্রহণ করতে পারবেন।
জনস্বার্থে মোটরগাড়ির গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ সেবার ক্ষেত্রে বৃদ্ধিকৃত ভ্যাটের হার সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অতিরিক্ত আরোপিত ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ফলে এ সংশ্লিষ্ট সেবা মূল্য বৃদ্ধি পাবে না।
একই বিবেচনায় নিজস্ব ব্র্যান্ডের তৈরি পোশাক ছাড়া অন্যান্য পোশাক বিপণনের ওপর অতিরিক্ত আরোপিত ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া নন এসি হোটেল, মিষ্টান্ন ভা-ার ও নিজস্ব ব্র্যান্ডের তৈরি পোশাক বিপণনের ক্ষেত্রে সেবার ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পুস্তকের সহজলভ্যতা, আধুনিক ও তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ই-বুক সেবায় স্থানীয় সরবরাহ ও আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।
অন্যদিকে যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় দ্রুতগামী, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব মেট্রোরেল সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া হজযাত্রীদের খরচ কমানোর লক্ষ্যে এনবিআর হজ টিকিটের ওপর আরোপযোগ্য আবাগারি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূল্যস্ফীতির টালমাটাল বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনসাধারণের কথা চিন্তা করে চাল, আলু, ভোজ্য তেলসহ বেশ কয়েকটি পণ্যে শুল্কছাড় দিয়েছে এনবিআর। তাতে রাজস্ব আহরণে কিছুটা ভাটা পড়ে। সেদিক বিবেচনায় শতাধিক পণ্যে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়ায়। তবে দেশের সর্বস্তরের মানুষ ও ব্যবসায়ী সংগঠনের অনুরোধে ভ্যাট বিষয়ে এনবিআর বিবেচনা করে।
‘১০ লাখ টন চাল গম আমদানি হচ্ছে’: দেশে খাদ্যশস্যের মজুদ ও সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার ১০ লাখ টন চাল-গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩ লাখ টন চাল-গম মজুদ আছে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ যেটা, আউশ ও আমনে ঘাটতি একটা হয়েছে। এখন সামনে আছে বোরো ফসল। আমরা আশা করছি, বোরোতে যদি ফলন ভালো হয়, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারব। তার জন্য আমরা অপেক্ষা করব না। আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। চাল ও গম মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টনের মতো আমদানি পাইপলাইনে আছে।’ তিনি আরও বলেন, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসব খাদ্যশস্য আমদানি করা হবে। দেশে প্রায় ১৩ লাখ টন চাল ও গম মজুদ আছে। এর মধ্যে ৮ লাখ ৮২ হাজার টন চাল এবং ৩ লাখ ৪১ হাজার টন গম মজুদ আছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে খাদ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘চালের দাম এখন বাড়ছে না। চালের দাম আরও কমলে খুশি হব। বিদেশ থেকে আমাদের আমদানি অব্যাহত থাকবে। আমদানির সোর্স হবে মাল্টিপল। প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করলে সহজে আনা যায়, দামও কম পড়ে। নেইবারিং কান্ট্রিকে আমরা যেমন গুরুত্ব দিচ্ছি। পাশাপাশি অন্যান্য দেশে দাম একটু বেশি হলেও আমরা আমদানি করছি। মাল্টিপল সোর্সকে সামনে রাখছি। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ধান সংগ্রহ কম হয়। এ কারণে যেমন ময়েশ্চার চাওয়া হয়, সেটা তারা দিতে পারে না। মিলগুলো কাঁচা ধান নিয়ে যাচ্ছে। করপোরেট মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পারা যাচ্ছে না। আশা করছি, ইনশাআল্লাহ যে মজুদ ও সরবরাহ রয়েছে, তাতে কোনো ঘাটতি হবে না।’
খাদ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘গম আমদানি হবে ৩ লাখ টন। এর মধ্যে ২ লাখ টন গম রাশিয়া থেকে গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্টের (জিটুজি) ভিত্তিতে ডেফার্ড পেমেন্ট আমদানি করব। মিয়ানমারের সঙ্গে ১ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি হয়েছে। ২২ হাজার টন চাল এরই মধ্যেই চলে এসেছে। বাকি চাল আসবে ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তান থেকে। তিনি বলেন, আমদানি করা চালগুলোর কেজি ৫৬ থেকে ৬০ টাকা পড়ছে। চাল ও গম মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টন আমদানি করা হবে। তবে এটা নির্ভর করবে বোরো ধানের সংগ্রহের ওপর। বোরো ধান যদি আল্লাহর রহমতে সংগ্রহ করা যায় তাহলে আমদানির পরিমাণ কমবে। আর বোরো উৎপাদন যদি ব্যাহত হয় তাহলে আমদানি বেড়ে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, বোরো সংগ্রহ শুরু হয় ১৪ এপ্রিল বা পহেলা বৈশাখে। হাওরের বোরো ধান প্রথমে আসে। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত যদি সময় পাওয়া যায় (আগাম অতিবৃষ্টি না হয়) তাহলে হাওরের ফসলটা শতভাগ উঠে যায়। হাওরে ২৫ লাখ টন পর্যন্ত ধান উৎপাদন হতে পারে।
খাদ্য উপদেষ্টা বলেন, যে চালটা বিদেশ থেকে আনছি এটার মান ভালো। এটা আমরা ওএমএসের মাধ্যমে ৩০ টাকা কেজিতে দিচ্ছি। দেশের কৃষকদের কথাও আমাদের মাথায় রাখতে হয়।