বাড়ি থেকে ক্যানসার আক্রান্ত বোনকে তাড়ালেন ভাইয়েরা

পৈতৃক সূত্রে সাড়ে ৫ শতাংশ জমি পেয়েছিলেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারোবাড়ি ইউনিয়নের গলকু-ার আম্বিয়া খাতুন (৫৮)। তার থেকে তিন শতাংশ মেয়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন তিনি। বাকি আড়াই শতাংশ জায়গায় সামনে দিকে একটা দোকান করে ভাড়া দিয়েছেন আর পেছনের অংশে ঘর করে স্বামীকে নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের। ঘর থেকে আনতে দেওয়া হয়নি আম্বিয়ার চিকিৎসার কাগজপত্রও। ফলে ব্যবহৃত হচ্ছে তার চিকিৎসা কার্যক্রম। দিন দিন তার অবস্থা খারাপ হচ্ছে আরও। 

অবশ্য আম্বিয়া খাতুননের অভিযুক্ত বড় ভাই নুরুল আলম দুলাল মিয়ার দাবি, ওই জমি তাদের আরেক ভাই মো. সাইফুল আলম জোসনা মিয়ার। আম্বিয়ার ছেলে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে সে জমি তার মায়ের নামে করিয়ে নিয়েছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর সাইফুল ফের সে জমির দখল নিয়েছেন।  

এদিকে স্ত্রীর জমি জোরপূর্বক দখল করায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আম্বিয়ার স্বামী শেখ আবুল হাসেম। পুলিশ বলছে, ওই জমি নিয়ে আদালতে দেওয়ানি মামলা চলছে। তাই কে জমির মালিক বা কার দখলে আছে সেটা দেখার এখতিয়ার তাদের নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে যেন কোনো ধরনের সহিংস ঘটনা না ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক আছে তারা।

আম্বিয়া খাতুনের মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলে শেখ তারিকুল হাসান মিলন হোয়াটসঅ্যাপে কল করে প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাই আমার আম্মারে বাঁচান, জায়গা গেলে জায়গা পাব। আম্মা চলে গেলে আর পাব না। আম্মার চিকিৎসার কাগজগুলো নিয়ে দেন ভাই।’

মিলনের আবেদনের সূত্রে গলকু-ায় নিয়ে যায়, আম্বিয়া খাতুনরা ছয় বছর ধরে ওই বাড়িতে বসবাস করেছিলেন। গত ২০২৩ সালে আম্বিয়ার ক্যানসার ধরা পড়ে। ওই বাড়িতে থেকেই চলছিল ক্যানসার চিকিৎসা। কিন্তু ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দুলাল ও মো. সাইফুল তাদের লোকজন নিয়ে আম্বিয়া খাতুনকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে দিয়ে ঘরে তালা লাগিয়ে দেন। এখন তারা অবস্থান করছেন শেখ আবুল হাসেমের ইটাউলিয়া গ্রামের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে কথা হয় আম্বিয়া খাতুনের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গ তুলতেই হাউমাউ করে কান্না শুরু করেন তিনি। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আমার ভাইডিরে আতো-পায়ো (হাত-পা) ধইরা কইছি ভাইরে তোরা আমারে মরণের লাইগ্যা দিস না। ঘরের ভিত্তে (ভেতরে) আমার ওষুধপাতি, চিকিৎসার কাগজপাতি এইডি আমারে দে।’ এই সময় আমার ছুডু ভাইডা (দুলাল) কয়তাছে এনতে যাগা, কোনো কাগজপাতি নাই। আর তুই মইরা যা। তুই মরলে আমরার কী?’ আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘আমি মরি-বাঁচি, আমার জমিডা আমারে ফিরত লইয়া দেওহাইন।’

সেখানে কথা হয় আম্বিয়া খাতুনের মেয়ে হাছিনা ওরফে হ্যাপির সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার মামাদের জন্যই আম্মার এমন অবস্থা। তারা জমি কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি কাগজপত্র আটকে রেখে আম্মাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন। আমি তাদের বিচার চাই।’

তবে অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে অভিযুক্ত নুরুল আলম দুলাল বলেন, ‘ওই জমিটা আমার ছোট ভাই সাইফুল আলম ওরফে জোসনা মিয়ার। সে ওই জমিতে ঘর এবং দোকানঘর নির্মাণ করেছে। এরপর আওয়ামী লীগের আমলে প্রভাব খাটিয়ে আম্বিয়ার ছেলে সেটা দখল করে তার মায়ের নামে কাগজ করায়। ৫ তারিখের পর সাইফুল ফের সেটা দখলে নেয়।

তিনি বলেন, ঘরে থাকা সমস্ত জিনিসপাতি পুলিশের উপস্থিতিতে আমার ভগ্নিপতি এবং ভাগনে বউকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আর ওষুধ এবং চিকিৎসার কাগজপাতি ওই ঘরে ছিল কি না তাও আমার জানা নাই। কিংবা পরেও পাওয়া যায়নি।’

ঈশ্বরগঞ্জ থানায় অভিযোগ দিলে সেটা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় আঠারোবাড়ি (রায়ের বাজার) পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শককে। এ প্রসঙ্গে তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, “অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। তদন্ত করে জানা যায়, ওই জমিটা নিয়ে আদালতে দেওয়ানি মামলা চলমান। যে কারণে পুলিশের কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে এটাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে আমরা তৎপর আছি।”