শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে পরিবার নিয়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বেড়াতে এসেছিলেন চাকরিজীবী সুর্বণা আক্তার। মেলায় আসতে যানজটের কারণে তাকে ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। কাঞ্চন ব্রিজের পূর্ব পাড় থেকে মেলা পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রাস্তা তাদের হেঁটে আসতে হয়েছে। এতে তার পাঁচ বছরের শিশু মেলায় প্রবেশ করেই খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়ে। শুধু সুবর্ণা আক্তার নন, গতকাল শুক্রবার ২৪তম দিনে পূর্বাচলে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় আসতে দর্শনার্থীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এদিন মেলায় দর্শনার্থীর সমাগম অনেক বেশি হওয়ায় মেলার চারপাশের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে দর্শনার্থীদের দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে মেলায় যেতে হয়।
জানা গেছে, ১৯৯৫ সাল থেকে বাণিজ্য মেলার আসর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বসলেও চার বছর ধরে এ আসর পূর্বাচলে বসছে। পূর্বাচলের আসরে যত দিন যায়, ততই বাড়ে দর্শনার্থীর ভিড়। ভিড়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে মানুষের ভোগান্তিও। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে মেলায় আসতে সময় লাগে চার-পাঁচ ঘণ্টা। এর অন্যতম কারণ মেলা ঘিরে এশিয়ান বাইপাস, গাজীপুর বাইপাস ও তিনশ ফুট সড়কের দীর্ঘ যানজটের কারণে রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ যানজটের কারণে মেলায় দর্শনার্থীদের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরাও। এ ছাড়া রাস্তা দখল করে অবৈধ পার্কিং ও অবৈধভাবে বসা ফুটপাতের দোকান তো আছেই। এ কারণেও যানজটের পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এ ছাড়া মেলায় যাওয়া-আসায় তিন থেকে চারগুণ ভাড়া করা হচ্ছে। ভোগান্তি পেরিয়েও মেলায় আসছেন দর্শনার্থীরা। মেলা শেষের দিকে হওয়ায় দর্শনার্থীর সঙ্গে সঙ্গে স্টলগুলোতে বাড়ছে ক্রেতার ভিড়। এতে ব্যবসায়ী ও বিক্রয়কর্মীদের যেন দম ফেলার ফুরসত নেই।
ভোগান্তি ও বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার। যানজটসহ নানা ভোগান্তি পেরিয়ে মেলায় এসে দর্শনার্থীরা নিম্নমানের পণ্য দেখে হতাশ হয়ে ফিরছেন।
মেলা পুরোপুরি জাঁকজমক পূর্ণ হওয়ায় দর্শনার্থীরাও খুশি। ছুটির দিনে মেলা সকাল ১০ থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখা হয়। সকাল থেকেই দর্শনার্থীরা আসতে শুরু করেন। সকালে দর্শনার্থী কিছুটা কম থাকলেও বিকেলে পুরো মেলা দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে। ছুটির দিন হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও তাদের স্টলকে নানা রঙে বাতি জ্বালিয়ে সাজ-সজ্জায় রাঙ্গিয়ে তুলেছেন। মেলা সেজেছে অপরূপ রূপে। মেলার ভেতরে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় রাখা হয় নাচগানসহ নানা আয়োজন। এদিন মেলায় বেশিরভাগ স্টলেই ছিল উপচে পড়া ভিড়।
তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে গৃহস্থালি, ইলেকট্রনিক্স, প্রসাধনী ও কাশ্মীরি স্টলগুলোতে। এ ছাড়া শিশু পার্ক ও রেস্তোরাঁগুলোতে বসার জায়গা ছিল না। মেলার ভেতরে শিশু পার্কে দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। শিশু পার্কের ভেতরে রাইডগুলোর টিকিট কাটতে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। বেশি লোকের সমাগম হওয়ায় রেস্তোরাঁগুলোয় খাবারের দাম বেশি নেওয়া হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন মেলা আসা দর্শনার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এদিকে হাইওয়ে পুলিশ যানজট নিরসনের চেষ্টা করলেও এত লোকের সমাগমে তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। যানজটে আটকে থাকে শত শত যানবাহন।
জিতু ভূঁইয়া নামে মেলার এক কসমেটিক্স ব্যবসায়ী বলেন, মেলায় এত লোকের সমাগম আগে দেখিনি। মেলা শেষের দিকে হওয়ায় আমরাও পণ্যে অনেক ছাড় দিচ্ছি। ছাড় পেয়ে ক্রেতারাও পণ্য কিনছেন হরদম।
সাইদুর রহমান নামে এক থ্রি-পিছ ব্যবসায়ী বলেন, মেলায় এত লোকের সমাগম দেখে ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটেছে। এত টাকা দিয়ে মেলায় স্টল বরাদ্দ নিয়েছি। বিক্রি আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো হচ্ছে। মেলায় বিক্রি বেশি হলে আমাদের লোকসান হবে না আশা করি। আমরা ক্রেতা আকর্ষণে বিভিন্ন ছাড় দিচ্ছি। ছাড় পেয়ে ক্রেতারাও কিনছেন নিজেদের পছন্দের পণ্য।
রাজধানীর ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে খোকন মিয়া স্ত্রীকে বাণিজ্য মেলায় বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, আমি সরকারি একটি ব্যাংকে চাকরি করি। শুক্রবার ছুটির দিন তাই স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে মেলা এসেছি। মেলায় অনেক ভিড়। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। ভিড়ের কারণে মেলার চারপাশের রাস্তায় অনেক যানজট। যানজটের কারণে দুই কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে মেলায় এসেছি।
কথা হয় মহিবুর রহমান নামে এক দর্শনার্থীর সঙ্গে। তিনি বলেন, মেলায় অনেক লোকের সমাগম হয়েছে। মেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। মেলার সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। এখানে গান শুনে ভালো লাগল। তবে আসার সময় যে যানজট দেখলাম, তা কতক্ষণে শেষ হবে তা বলা যাচ্ছে না।
কথা হয় সুমনা নামে এক দর্শনার্থীর সঙ্গে। তিনি বলেন, মেলায় আসতে দুপুর ২টার দিকে যাত্রাবাড়ী থেকে রওনা হই। মেলায় এসে পৌঁছেছি সন্ধ্যা ৭টার দিকে। দীর্ঘ যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছিলাম। মেলা থেকে ফিরতেও একই ভোগান্তিতে পড়তে হবে। মেলা দেখলাম এবার অনেক জমে উঠেছে।
যানজটে আটকে থাকা পিকআপচালক রাসেল বলেন, ‘তিন ঘণ্টা ধইরা মেলার সামনে জ্যামে বইয়া রইছি। মাল লইয়া টঙ্গী যামু। এই জ্যাম কহন শেষ অইব কহন যামু। আগে জানলে মেলার সামনে দিয়ে না গিয়া অন্যদিক দিয়া যাইতাম।’
কথা হয় অটোরিকশাচালক আব্বাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কাঞ্চন ব্রিজ ও তিনশ ফুট সড়ক পুরোটাই যানজটে আটকে আছে। গাড়ি একটু নড়ছে না। যানজটের কারণে দর্শনার্থীরা হেঁটে মেলায় যাচ্ছেন। এই যানজট কখন শেষ হবে কেউ বলতে পারে না।
গেইট ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ডিজি ইনফোটেক লিমিটেডের ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় মেলায় প্রচুর লোকের সমাগম হয়েছে। আমরা মেলায় আসা দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে এ বছর ই-টিকিটিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছি। যাতে করে দর্শনার্থীরা নির্বিঘেœ মেলায় প্রবেশ করতে পারেন। তবে অতিরিক্ত লোকের সমাগম হওয়ায় ম্যানুয়ালিও দর্শনার্থীদের মেলায় প্রবেশ করানো হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সচিব ও বাণিজ্য মেলা পরিচালক বিবেক সরকার বলেন, শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় মেলা কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল। মেলায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দিতে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে। মেলা দর্শনার্থীদের আসা যাওয়ার জন্য ২০০টির বেশি বিআরটিসির শাটল বাস রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি হলে বাসের সংখ্যাও বাড়ানো হয়।