পুলিশ নিষ্ক্রিয় উদ্বিগ্ন মানুষ

ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলা। বুড়িগঙ্গার পশ্চিমতীর ঘেঁষা উপজেলাটির পশ্চিমপাশ দিয়ে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী নদী। দুই পাশে নদীর কারণে অনেক আগে থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পরিচিত জনপদটি। গেল কয়েক বছর ধরে আবাসন ব্যবসাও রমরমা সেখানে। বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও উপজেলাটিতে তুলনামূলক বেশি। তবে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশের ‘নিষ্ক্রিয়তায়’ অপরাধের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে কেরানীগঞ্জ। বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো অপরাধ। খুন, ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে গত পাঁচ মাসে। এ ছাড়া দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও প্রায় প্রতিদিন হামলা, সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটছে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে এসব ঘটনায় পুলিশের তৎপরতা নেই! পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বাড়ছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত পাঁচ মাসে কেরানীগঞ্জে বিভিন্ন কোন্দল কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনায় আহতের সংখ্যা আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে। কেন, কী কারণে এ ধরনের হামলা বাড়ছে, এর প্রতিকারইবা কী তার সুস্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

গত কয়েক মাসে জিনজিরার কসাইভিটা, নজরগঞ্জ, আগানগর বেড়িবাঁধ এলাকা, চুনকুটিয়া ঝিলমিল সড়কসহ কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হলেও কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি পুলিশের নজরদারিও এসব এলাকায় দেখা যায়নি।

জিনজিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা মাহবুব আলম বলেন, রাতের কেরানীগঞ্জ এখন আগের চেয়ে বেশি অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। জিনজিরায় এমন প্রকাশ্যে ছিনতাই আগে তেমন হতো না। অপরাধ বাড়লেও পুলিশ কিছুই করছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) এক স্টাফ জানান, কেরানীগঞ্জের বেশিরভাগ আহত ব্যক্তিই মিটফোর্ডে চিকিৎসা করান। গত দুই-তিন মাসে জখম হয়ে অনেকেই এসেছেন কেরানীগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ছিনতাইকারীর হামলায় আহত। অনেকেই ছিলেন দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত। পুলিশকে জানালে সমাধান হয় না, বরং ভোগান্তি বাড়ে বলে এসব ভুক্তভোগীর বেশিরভাগই পুলিশকে জানান না ঘটনাগুলো।

গত ডিসেম্বরে মাদক কারবারিদের দুই গ্রুপের মারামারির ঘটনায় রনি (২৬) নামে এক যুবক নিহত হন। ওই ঘটনায় আহতরা কেরানীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও তাদের ওপর ফের হামলা হয়। হাসপাতাল এলাকায়ই ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনা এলাকাবাসীর মধ্যে বড় রকমের আতঙ্ক ছড়ায়। কেরানীগঞ্জে গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক হামলার ঘটনাও দেখা গেছে। তবে এসব রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ সক্রিয় না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় লোকজন।

তবে কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগস্টের পর থেকে প্রতি মাসেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটু একটু করে স্বাভাবিক হচ্ছে। সারা দেশের মতোই এখানেও একটু সময় লাগবে। অবশ্য বর্তমানে কেরানীগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিনাত ফৌজিয়া বলেন, ৫ আগস্টের পর সারা দেশের মতো কেরানীগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপট এখন পরিবর্তন হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তখনকার চেয়ে এখন অনেক ভালো অবস্থানে আছে। জনমানুষের নিরাপত্তায় আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। উপজেলা প্রশাসনসহ, থানা পুলিশের জনবলের কমতি থাকায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও শিগগিরই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।