দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর সিউল। শহরটি দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রশাসন ও শিল্প কারখানার প্রাণকেন্দ্র। রাজধানী সিউলের অন্যতম বাণিজ্যিক জেলা ইটাওয়ান। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর বিখ্যাত সব খাবার পাওয়া যায় এই শহরে। তাই ইটাওয়ানকে বলা হয় সিউলের আন্তর্জাতিক জেলা। এই জেলায় মুসলমানদের বসবাসও তুলনামূলক বেশি। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় দুই লাখ মুসলমানের বসবাস, যাদের চল্লিশ শতাংশই ইটাওয়ানে বাস করে।
ইটাওয়ান শহরের প্রধান সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত একটি ছোট রাস্তা, নাম মুসলিম স্ট্রিট। সেখানে চোখে পড়বে কোরিয়ান ও আরবি বর্ণে লেখা সাইনবোর্ড। রাস্তাটি ধরে কিছুটা এগোলেই সিউল সেন্ট্রাল মসজিদ। ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবের সহায়তায় নির্মিত এই মসজিদটি কোরিয়ার প্রথম ও বৃহত্তম মসজিদ। এটি শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং কোরিয়ান মুসলিমদের শান্তির নীড়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ৫১ মিলিয়ন জনসংখ্যার মাত্র ০.৩ শতাংশ মুসলিম। এদের বেশিরভাগই বিদেশি, যারা মূলত প্রবাসী শ্রমিক। কোরিয়ান মুসলিমরা সংখ্যায় খুবই কম। তাদের একজন ইওম মিন-আ, যিনি ৩৫ বছর বয়সী একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘কোরিয়ান মুসলিমরা কোরিয়ার সবচেয়ে ছোট সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর একটি। এখানে পরস্পর সম্প্রীতির চর্চা চোখে পড়ার মতো। ইটাওয়ানে আমি যখন বলি, আমি একজন মুসলিম বা মসজিদে নামাজ পড়ি, কিংবা আরবীয় পোশাক পরি, তখন কেউ আমাকে অদ্ভুতভাবে দেখে না। এটা আমাকে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়। মুসলিম হিসেবে যে একাকিত্ব অনুভব করি, সেটার অনেকটাই এখানে এসে কমে যায়।’ ইওম মিন-আ আরও বলেন, ‘ইটাওয়ানেই আমি আমার মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি। যখন মসজিদে নামাজ পড়ি বা আরবীয় খাবার খাই, তখন মনে হয় আমি এ দেশে একা নই। এই জায়গাটি আমাকে বারবার টানে।’
সিউল সেন্ট্রাল মসজিদ শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং এটি কোরিয়ান মুসলিম সম্প্রদায়ের শক্তি ও একতার প্রতীক। মসজিদটি রমজান, ঈদুল আজহা এবং ঈদুল ফিতরের মতো ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের প্রধান কেন্দ্র।
ব্যবসায়ী কিম জিন-উ বলেন, ‘আমার সন্তান জন্মের আগে প্রায়ই রমজান ও ঈদের সময় মসজিদে যেতাম। এটি আমাদের কাছে বাড়ির মতো একটি জায়গা। আমরা এখানে আত্মার শান্তি খুঁজে পাই।’
ইটাওয়ান শুধু মসজিদের জন্য নয়, বরং হালাল খাদ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্যও প্রসিদ্ধ। কিমের পরিবার এখানে আসেন আরবীয় খাবার ও মসলা কিনতে। তার স্ত্রী মূলত মরোক্কোর খাবার রান্না করেন। কিম বলেন, ‘আমার পরিবার ইটাওয়ান থেকে হালাল মাংস এবং আরবীয় মসলা কিনে। এখানকার বাজারগুলোতে কোরিয়ান পণ্যের চেয়ে আরবীয় পণ্য বেশি পাওয়া যায়।’
ইটাওয়ানের মুসলিম সম্প্রদায় শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, অন্যান্য স্থানীয়দের কাছেও বৈচিত্র্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উদাহরণ। ৮৩ বছর বয়সী কিম সি, যিনি গত ৪০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছেন, তিনি বলেন, ‘আমি বিদেশি মুসলিম কর্মচারী নিয়োগ করেছি। তারা খুব আন্তরিক মানুষ। আমার অন্যান্য প্রতিবেশীদের মতোই তারা।’
ইটাওয়ান মুসলিম ও অমুসলিমদের জন্য এক শান্তিপূর্ণ স্থান, যেখানে বৈচিত্র্যের উদযাপন হয়। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য শুধুই একটি জায়গা নয়; বরং এটি তাদের শান্তিময় আশ্রয়স্থল, বন্ধুত্বের বন্ধন এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
আরব নিউজ অবলম্বনে