আরবি ‘মেরাজ’ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বগমন। লাইলাতুল মেরাজ বা মেরাজের রজনী উপমহাদেশে শবেমেরাজ হিসেবে পরিচিত। এই রাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেন এবং মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মেরাজের পটভূমি সম্পর্কে আলেমরা বলেন, জন্মের আগেই বাবাকে হারান প্রিয় নবীজি (সা.)। ছয় বছর বয়সে হারান মাকে। আট বছর বয়সে দাদার ইন্তেকালের পর শিশু নবীর দায়িত্ব নেন পিতৃতুল্য চাচা আবু তালেব। শাহ আবদুল হক মুহাদ্দেস দেহলভি (রহ.) বলেন, আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মতে আবু তালেব পূর্বপুরুষের ধর্মের ওপরই মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর ছায়ার মতো নবীজির সঙ্গে ছিলেন চাচা আবু তালেব। কুরাইশরা যখন নবীজির ওপর চরম অত্যাচার শুরু করেছে তখনো চাচা আবু তালেব তাকে ছেড়ে যাননি। নবুওয়াতের দশম বর্ষের রজব মাসে আবু তালেব মারা যান। চাচা হারানোর শোক নবীজির হৃদয় চৌচির করে দেয়। এর ঠিক তিন দিন পর প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-ও ইন্তেকাল করেন।
কষ্টের পর কষ্টের ঢেউ নবীজির হৃদয়ে আছড়ে পড়ে। এ জন্য ঐতিহাসিকরা এ বছরকে ‘আমুল হুজন’ বা দুঃখ-কষ্টের বছর বলে অভিহিত করেছেন। একে তো স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে স্বগোত্রীয়দের বিরোধিতা নবীজির দাওয়াতি মিশনকে কঠিন করে তোলে। নবীজির পেরেশানি ও মনোকষ্ট দূর করার জন্য এবার আরশের মালিক সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের কাছে নিয়েই প্রিয় বন্ধুকে সান্ত্বনা দেবেন পরম যতেœ। নবুওয়াতের দশম বর্ষের রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে বিশেষ নিরাপত্তায় প্রথমে বোরাক তারপর রফরফে চড়ে নবীজি (সা.) মহান আল্লাহর কাছে যান। এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মহিমান্বিত সেই সত্তা, যিনি তার বান্দাকে রাতের এক অংশে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন তার নিদর্শনাবলি অবলোকন করার জন্য। যার চারপাশে আমি বরকতে পূর্ণ করে দিয়েছি। নিশ্চয় তিনি সব শোনেন ও দেখেন।’ (সুরা ইসরা ১)
ছারছিনা থেকে প্রকাশিত মাওলানা শাহ আবু নসর নেছারুদ্দিন আহমদ সংকলিত ‘রহমতে দোজাহাঁ’ কিতাবে মেরাজের তারিখ সম্পর্কে কয়েকটি মতামত তুলে ধরা হয়েছে। ইমাম তাবারি বলেন, নবুওয়াত প্রাপ্তির বছরই নবীজির মেরাজ হয়েছে। ইমাম নববী ও ইমাম কুরতুবির মতে, নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে মেরাজ হয়েছে। আল্লামা মনসুরপুরির মতে, মেরাজ হয়েছে নবুওয়াতের দশম বর্ষের রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে। মেরাজ সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, নবীজি (সা.) কর্র্তৃক সশরীরে সজ্ঞানে জাগ্রত অবস্থায় মেরাজ হয়েছে।
হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে পাওয়া য়ায়, এক রাতে আল্লাহর রাসুল (সা.) শুয়েছিলেন। হঠাৎ জিবরাইল (আ.) এসে নবীজিকে জাগিয়ে তার বক্ষ মোবারক বিশেষ উপায়ে বিদারণ করে জমজমের পানি দিয়ে হৃদয় ধুয়ে হেকমতে পূর্ণ করে আবার প্রতিস্থাপন করেন। এরপর আনা হয় নবীজিকে বহন করার জন্য সওয়ারি। প্রাণীটি গাধার চেয়ে বড়, ঘোড়ার চেয়ে ছোট। নাম বোরাক। রঙ সাদা। এটা এতটাই ক্ষিপ্রগতির বাহন, যার একেকটি কদম পড়ে দৃষ্টির শেষ সীমায় গিয়ে। এভাবে নবীজি (সা.) মুহূর্তেই পৌঁছে যান বাইতুল মুকাদ্দাসে। বোরাক বেঁধে রাখা হয় পাথর ছিদ্র করে। যে পাথরে অপরাপর নবীরা নিজেদের বাহন বেঁধে রাখতেন। নবীজি সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় জিবরাইল (আ.) নবীজির সামনে দুটি পেয়ালা পেশ করেন। একটি দুধের, অপরটি শরাবের। নবীজি (সা.) দুধের পেয়ালা গ্রহণ করেন। জিবরাইল (আ.) বলেন, আপনি স্বভাবসিদ্ধ বিষয়টি নির্বাচন করেছেন। আপনি যদি শরাবের পেয়ালা নিতেন তাহলে আপনার উম্মত বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত।’ (সহিহ বুখারি ৩৩৯৪)
এরপর শুরু হয় ঊর্ধ্বজগতের সফর। জিবরাইল (আ.) নবীজিকে নিয়ে চললেন। প্রথম আসমানে গিয়ে কড়া নাড়লেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? উত্তর দেওয়া হলো, আমি জিবরাইল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সঙ্গে কে? আবার বললেন, মুহাম্মদ (সা.)। জিজ্ঞেস করা হলো, তার কাছে কি আপনাকে পাঠানো হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ। এরপর নবীজিকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলা হলো মারহাবা, উত্তম আগমনকারীর আগমন ঘটেছে! খুলে দেওয়া হলো নবীজির জন্য আসমানের দরজা।
নবীজি (সা.) প্রথম আসমানে গেলেন। সেখানে ছিলেন হজরত আদম (আ.)। জিবরাইল পরিচয় করিয়ে দিলেন। নবীজি (সা.) আদম (আ.)-কে সালাম জানালেন। বাবা আদম (আ.) সালামের জবাব দিলেন। নবীজিকে সাদর অভিবাদন জানিয়ে বললেন মারহাবা, নেককার পুত্র ও নেককার নবী। হজরত আদম (আ.) নবীজির জন্য দোয়া করলেন। এরপর নবীজিকে দ্বিতীয় আসমানে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে দেখতে পেলেন হজরত ঈসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.)-কে। তাদের সঙ্গে নবীজির সালাম বিনিময় হলো। তারা নবীজিকে স্বাগত জানিয়ে বললেন মারহাবা, আমাদের পুণ্যবান ভাই এবং সজ্জন নবী। তারা নবীজির জন্য দোয়া করলেন। এরপর নবিজিকে তৃতীয় আসমানে নিয়ে য়াওয়া হলো। সেখানে দেখা হলো হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে। তার সঙ্গে নবীজির সালাম ও কুশল বিনিময় হলো। নবীজি (সা.) বলেন, হজরত ইউসুফ (আ.)-কে দুনিয়ার অর্ধেক সৌন্দর্য দেওয়া হয়েছে! এরপর চতুর্থ আসমানে হজরত ইদরিস (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। সালাম ও কুশল বিনিময় হলো। হজরত ইদরিস (আ.) নবীজির জন্য দোয়া করলেন। এরপর পঞ্চম আসমানে হজরত হারুন (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। এরপর ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে এবং সপ্তম আসমানে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-সঙ্গে দেখা হলো। জিবরাইল (আ.) পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি মুসলিম জাতির পিতা, সালাম জানান। নবীজি হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে সালাম জানালেন।
এরপর নবীজিকে নিয়ে যাওয়া হলো সিদরাতুল মুনতাহায়। সেখানে অবস্থিত কুল বৃক্ষের একেকটি পাতা হাতির কানের মতো। আর একেকটি ফল মটকার মতো বড় বড়। জিবরাইল (আ.) বললেন, এটা সিদরাতুল মুনতাহা। এখানে চারটি নহর রয়েছে। দুটি অদৃশ্য আর দুটি দৃশ্যমান। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, দৃশ্যমান নহর কোনগুলো? জিবরাইল (আ.) বললেন, দৃশ্যমান দুটি হলো দুনিয়ার নীল নদ ও ফুরাত নদী। আর অদৃশ্য দুটি জান্নাতে। এরপর আল্লাহতায়ালার সঙ্গে নবীজির দেখা হলো। দিন-রাতে উম্মতের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করে দিলেন। হজরত মুসার (আ.)-এর পরামর্শে নবীজি বারবার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে নামাজের ওয়াক্ত পাঁচে এ নামিয়ে আনেন। সর্বশেষ আল্লাহ বলেন, দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে প্রত্যেক নামাজের বিনিময়ে দশ ওয়াক্ত নামাজের সাওয়াব দেওয়া হবে। এভাবে বান্দা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব পাবে। (সহিহ বুখারি ৩৮৮৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজ থেকে ফিরে আসার পর মুশরিকরা ইসরা ও মেরাজের ঘটনা শুনে উপহাস ও কটাক্ষ করতে লাগল। বিভিন্নভাবে নবীজির দিকে প্রশ্নের তীর ছুড়তে লাগল। তারা বাইতুল মুকাদ্দাসের পূর্ণ বিবরণ শুনতে চাইল। নবীজি এমন প্রশ্নে খুবই বিব্রত হন। নবীজি বলেন, এ রকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আমি আগে পড়িনি। আল্লাহতায়ালা প্রিয় বন্ধুকে সাহায্য করলেন। নবীজির চোখের সামনে মেলে ধরলেন বাইতুল মুকাদ্দাসের দৃশ্য। নবীজি দেখে দেখে তাদের প্রত্যেকটি জিজ্ঞাসার বিস্তারিত জবাব দিলেন। (সহিহ বুখারি ৩৮৮৬)