ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে নামাজ অন্যতম। ইমানের পর নামাজই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। মেরাজের রাতে মহান আল্লাহ হজরত রাসুল (সা.)-কে তার সান্নিধ্যে নিয়ে যান। উপহার দেন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ। হাদিসে নামাজকে বেহেশতের চাবি বলা হয়েছে। কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে নামাজের। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা মুমিনদের জন্য ফরজ।’ (সুরা নিসা ১০৩) মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর যারা তাদের নামাজে যতœবান তারাই (জান্নাতের) ওয়ারিশ, তারা ফেরদাউসের ওয়ারিশ হবে এবং সেখানে চিরকাল থাকবে।’ (সুরা মুমিনুন ৯-১১)
মেরাজের রাতে নামাজ যেভাবে ফরজ হয়, সেই বিষয়ে বুখারি শরিফে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি মক্কায় থাকা অবস্থায় আমার ঘরের ছাদ খুলে দেওয়া হলো। তারপর জিবরাইল (আ.) এসে আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। আর তা জমজমের পানি দিয়ে ধুলেন। অতঃপর জিবরাইল (আ.) আমাকে দুনিয়ার আসমানের দিকে নিয়ে চললেন।’
নবীজি (সা.) আসমানগুলোতে আদম (আ.), ইদ্রিস (আ.), মুসা (আ.), ইসা (আ.) ও ইব্রাহিম (আ.)-এর সাক্ষাৎ পান। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন দুনিয়ার আকাশে এলাম তখন জিবরাইল (আ.) আসমানের রক্ষক প্রহরী ফেরেশতাকে বললেন, দরজা খোলো। আসমানের প্রহরী বললেন, আপনি কে? জিবরাইল (আ.) বললেন, আমি জিবরাইল। প্রহরী বললেন, আপনার সঙ্গে কি কেউ রয়েছেন? জিবরাইল (আ.) বললেন, হ্যাঁ, মুহাম্মদ (সা.) রয়েছেন। প্রহরী তখন বললেন, তাকে কি ডাকা হয়েছে? জিবরাইল (আ.) বললেন, হ্যাঁ। এরপর যখন আমাদের জন্য দুনিয়ার আসমান খুলে দেওয়া হলো, আর আমরা দুনিয়ার আসমানে প্রবেশ করলাম, তখন দেখি সেখানে একজন বসে আছেন। যার ডানে ও বাঁয়ে অনেকগুলো মানুষের আকৃতি রয়েছে। তিনি ডানদিকে তাকালে হেসে উঠছেন, আর বাঁয়ে তাকালে কাঁদছেন। তিনি বললেন, স্বাগতম, হে সৎ নবী ও সৎ সন্তান। আমি জিবরাইল (আ.)-কে প্রশ্ন করলাম, এই ব্যক্তিটি কে? তিনি জবাব দিলেন, ইনি আদম (আ.)। তার ডানে-বাঁয়ে রয়েছে তার সন্তানদের রুহ। ডান দিকের লোকেরা জান্নাতি, বাঁ-দিকের লোকেরা জাহান্নামি। তাই ডানে তাকালে তিনি হাসছেন, বাঁয়ে তাকালে কাঁদছেন। এরপর জিবরাইল (আ.) আমাকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে উঠলেন। তারপর এর প্রহরীকে বললেন, দরজা খোলো। তখন এই প্রহরী প্রথম প্রহরীর মতোই প্রশ্ন করলেন। পরে দরজা খুলে দেওয়া হলো।’
রাসুল (সা.) বলেন, ‘জিবরাইল (আ.) যখন আমাকে নিয়ে ইদ্রিস (আ.)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ইদ্রিস (আ.) বলেন, হে ভাই ও পুণ্যবান নবী! আমি বললাম, তিনি কে? জিবরাইল (আ.) বললেন ইনি হচ্ছেন ইদ্রিস (আ.)। এরপর আমি মুসা (আ.)-এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলেন, হে সৎ নবী ও পুণ্যবান ভাই! আমি বললাম, ইনি কে? জিবরাইল (আ.) বললেন, ইনি মুসা (আ.)। অতঃপর আমি ইসা (আ.)-কে অতিক্রম করার সময় তিনি বললেন, হে সৎ নবী ও পুণ্যবান ভাই! আমি প্রশ্ন করলাম, তিনি কে? জিবরাইল (আ.) বললেন, তিনি ইসা (আ.)। তারপর আমি ইব্রাহিম (আ.)-কে পেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বললেন, হে পুণ্যবান নবী ও পুণ্যবান সন্তান! আমি বললাম, ইনি কে? জিবরাইল (আ.) বললেন, ইনি ইব্রাহিম (আ.)।’
ইবনে শিহাব বলেন, ইবনে হাজম (রহ.) আমাকে বলেছেন, ইবনে আব্বাস ও আবু হাব্বা আল-আনসারি উভয়েই বলতেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘এরপর আমাকে আরও ওপরে নিয়ে যাওয়া হলো। এমন একটি সমতল স্থানে নেওয়া হলো যেখানে আমি লেখার শব্দ শুনতে পেলাম।’
এর পরের বিষয়ে ইবনে হাজম ও আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা আমার উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করে দিলেন। আমি সেটা নিয়ে ফিরে আসি। মুসা (আ.)-কে পার হওয়ার সময় তিনি বললেন, আল্লাহ আপনার উম্মতের ওপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম, ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। তিনি বললেন, আপনি আপনার পালনকর্তার কাছে ফিরে যান, আপনার উম্মত তো এতটা পালন করতে পারবে না। আমি তখন ফিরে গেলাম। আল্লাহতায়ালা ৫ ওয়াক্ত কমিয়ে ৪৫ ওয়াক্ত করে দিলেন। এভাবে মুসা (আ.)-এর পরামর্শে প্রতিবার গিয়ে ৫ ওয়াক্ত করে কমিয়ে যখন মোট নামাজ ৫ ওয়াক্তে নেমে এলো তখন আল্লাহ বললেন, এই পাঁচটিই পুণ্যের হিসেবে ৫০ বলে গণ্য হবে। তখন আমি আবার মুসা (আ.)-এর কাছে গেলে তিনি আমাকে আবারও বললেন, আপনার প্রতিপালকের কাছে আরেকবার যান। আমি বললাম, আরেকবার আমার প্রতিপালকের কাছে যেতে আমি লজ্জাবোধ করছি।’
মেরাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়, এ ব্যাপারে সবাই একমত। কিন্তু সে রাতের নির্দিষ্ট সময় নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। কেউ বলেন, হিজরতের তিন বছর আগে। কেউ বলেন, এক বছর আগে। কারও মতে, নবুয়তের দশম বছরে। কেউ বলেন, নবুয়তের ১৫ মাস পরে মেরাজ সংঘটিত হয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির ২/৩)। এ সময়গুলোর ভেতরই তা সংঘটিত হয়।
নামাজ ছাড়া পরকালে মুক্তি লাভের উপায় নেই। তাই আসুন, নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করে নিয়মিতভাবে নামাজ আদায় করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সময় মতো নামাজ আদায় করার তওফিক দান করুন। আমিন।