ভিন্নমাত্রায় এবারের একুশে বইমেলা

দেশের পরিবর্তিত নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার শুরু হতে যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণে ভিন্নমাত্রা যুক্ত হয়েছে মেলায়। প্রকাশনায়, মেলা প্রাঙ্গণের বিন্যাস ও সাজসজ্জায়, প্রকাশকদের অংশগ্রহণে এসেছে বৈচিত্র্য। মেলার মূল প্রতিপাদ্যই করা হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান : নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ’।

গত বছর পর্যন্ত ভাষাশহীদদের নামে চারটি চত্বর ছিল মেলায়। এবার সেখান নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘জুলাই চত্বর’। মেলায় প্রকাশনা সংস্থা ও স্টল ইউনিট বেড়েছে। এতদিন মেলায় স্থান হয়নি এমন ইসলামি প্রকাশনা সংস্থাগুলো মেলায় এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক নানা ধরনের বই প্রকাশনার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রকাশকরা। অন্যবারের চেয়ে এবার মেলায় আরও বেশি পাঠক-ক্রেতা সমাগমের আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস নথিভুক্ত ও অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে প্রকাশনা ও প্রচারে নেওয়া হয়েছে বিশেষ আয়োজন। 

কাগজের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। রয়েছে সংকটও। বেড়েছে বাঁধাই ও ছাপাখানার খরচ। এতে মেলায় বইয়ের দাম কিছুটা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। খরচ সংকুলানে রয়েছে বইয়ের মান নিয়েও উদ্বেগ। 

মেলায় আয়োজন নিয়ে প্রকাশকদের রয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে মত। কেউ বলছেন, আরেকটু সুবিন্যস্ত হতে পারত প্রাঙ্গণের নকশা। প্যাভিলিয়ন মাঝখানে না রেখে ছড়িয়ে দেওয়া যেত চারপাশে। শিশু চত্বর ও নতুন প্রকাশকদের স্টলগুলো মনে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এত বড় পরিসরে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যেতে-আসতে বেশ কষ্ট হবে পাঠক-ক্রেতাদের। 

তারপরও মেলা নিয়ে বেশ আশাবাদী প্রকাশক-লেখকরা। তারা মনে করছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এবার মেলায় ব্যাপক পাঠক-ক্রেতার সমাগম হবে। নতুন উদ্দীপনা ও চেতনা নিয়ে মেলায় আসবে মানুষ। খুঁজে খুঁজে কিনবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বই।

লেখক, প্রকাশক ও বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বইমেলা প্রস্তুতির এমন চিত্র পাওয়া গেছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাসব্যাপী এ মেলা শুরু হতে যাচ্ছে। 

এবারের বইমেলাকে সবচেয়ে বড় পরিসরের মেলা বলে উল্লেখ করেছেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ও অমর একুশে বইমেলার সদস্য সচিব সরকার আমিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো বিবেচনায় এবারের বইমেলা হচ্ছে সবচেয়ে বড় পরিসরের মেলা। একশর মতো নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হচ্ছে। বইমেলার মূল থিম করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ। আমরা একটা ভালো বাংলাদেশ চাইলে বই সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সাহায্য করে।

এ কর্মকর্তা আরও বলেন, এবারের মেলাটা পাঁচ ভাগে ভাগ হচ্ছে। ভাষাশহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার তাদের নামে চত্বর হবে। আরেকটা চত্বর হবে জুলাই চত্বর। এটা নতুন যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও রিদম প্রকাশনী স্বত্বাধিকারী গফুর হোসেন। তিনি বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মেলার সার্বিক আয়োজন অনেক ভালো। স্টলের বিন্যাস ও সুন্দর করে করা হচ্ছে। আগে একটা গুমোট ভাব ছিল। এক ধরনের বইয়ে মেলা সয়লাব ছিল। এগুলো হয়তো এবার থাকবে না। বই প্রকাশনা সৃজনশীল ব্যবসা। সুতরাং প্রকাশকরা সৃজনশীল বইয়ের দিকেই মনোযোগ দেবেন আশা করি। লেখক-পাঠক-প্রকাশক সবার সহযোগিতা নিয়েই বইমেলাটা সফল হবে।

নতুন মাত্রার আশায় লেখক-প্রকাশক:

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক বিক্রেতা সমিতির দুবারের সাবেক সভাপতি ও আকাশ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, এবার জুলাই বিপ্লবের বই বেশি আসবে। এরপরই বিএনপি ও ইসলামের ধর্মীয় বই আসবে। মুক্তিযুদ্ধের বই কম আসবে। আমার প্রকাশনা থেকে জুলাই বিপ্লবের একটা বই বের হচ্ছে।

রিদম প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী গফুর হোসেন বলেন, এবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। প্রায় প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের বই আনছে। জনপ্রিয় লেখকদের বই তো থাকবেই। বইমেলা প্রকাশকদের বিগত এক বছরের আয়োজন। গবেষণাধর্মী বই আসবে। আমার প্রকাশনা থেকে আদিবাসীদের নিয়ে একটা বই আসবে। প্রত্যেকটা প্রকাশনার একটা পরিকল্পনা থাকে এবং সেই অনুযায়ী তারা বই আনে।

এ পর্যন্ত ৪৪টি বই প্রকাশ হয়েছে লেখক ইমরুল ইউসুফের। বেশিরভাগই শিশুসাহিত্য ও গবেষণাধর্মী বই। এবারও মেলায় শিশুদের জন্য লেখা সাতটি বই আসছে তার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার মনে হয় এবার অন্যবারের চেয়ে আরও বেশি লোক সমাগম হবে, মানুষের মধ্যে বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকবে। বাংলাদেশ যে নতুনভাবে গঠন হলো, যে জাগরণ হলো, সেটার প্রতিফলন থাকবে গোটা মেলায়। সাধারণ মানুষও সেখানে এই চেতনায় শামিল হবে। তারা মেলায় উজ্জীবিত হয়ে আসবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত বইপত্র কিনবে। এ-সংক্রান্ত অনেক বই আসবে। পাঠক-ক্রেতারা খুঁজে খুঁজে বের করে সেই বইগুলো কিনবে। আমার ধারণা এবার বইমেলায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।

প্রকাশনা সংস্থা ‘বাবুই’-এর স্বত্বাধিকারী ও লেখক কাদের বাবু বলেন, মেলার আয়োজন এবার একটু ভিন্ন ধরনের। অন্যবার মেলার যে রকমের পরিবেশ ছিল এবার একটু ভিন্নধর্মী। কারণ হলো অনেক নতুন প্রকাশনী এবং ইসলামি ঘরানার প্রকাশনী স্থান পেয়েছে। এটা ভালো হয়েছে। শিশুদের প্রকাশনীও আস্তে আস্তে ভালো হচ্ছে। আগে শিশু প্রকাশনার ক্ষেত্রে খুব ভালো বই বের হতো না, কপি বই বের হতো। শিশু প্রকাশনার ক্ষেত্রে আরেকটু নজর দেওয়া উচিত। এ ছাড়া পাইরেট বই বিক্রি না হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। কারণ পাঠক যখন দেখে ভুলে ভরা অগোছালো বই তখন পাঠক বইবিমুখ হয়ে পড়ে। যেনতেনভাবে অনুবাদের বই বের হচ্ছে। বাংলা একাডেমি বইমেলার যে টাস্কফোর্স তারা এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে পারেন। 

আয়োজনে ভিন্নমাত্রা, বৈচিত্র্য :

ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বইমেলার বৈশিষ্ট্যেও পরিবর্তন এসেছে বললেন আলমগীর সিকদার লোটন। তিনি বলেন, পরিবর্তন তো আছেই। গত ১৫ বছর যেসব প্রকাশক যে চেতনার ওপর ভর করে প্রকাশনা ব্যবসা করেছে, এবার সেটা নেই। ইসলাম ধর্মীয় বই যারা করত তারা মেলায় আসত না, এখন তাদের মেলায় একটি স্থান হয়েছে। এটা ভালো হয়েছে। 

এ প্রকাশক নেতা আরও বলেন, পুরনো কিছু প্রকাশকের ক্ষেত্রে মেলায় অংশ নেওয়া একটা সমস্যা ছিল। এসব প্রকাশকের বিরুদ্ধে বিগত সময়ে প্রকাশনায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের উপযুক্ত স্টলই দেওয়া হয়েছে। আগামীতে যাতে সাধারণ প্রকাশকরা সরকারকে বই সরবরাহের সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

স্টল বিন্যাসে খুশি-অখুশি:

কাদের বাবু বলেন, স্টল বিন্যাস হিজিবিজি হয়েছে। কিছু জায়গায় স্টল সুবিন্যস্ত করার সুযোগ ছিল। বাংলা একাডেমি কর্র্তৃপক্ষ এসব ব্যাপারে প্রকাশকদের মতামত কখনোই নেয় না। কোনোবারই মেলার লেআউট ভালো হয় না। যেখানে শিশু চত্বর দেওয়া হয়েছে সেটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ করে ফেলা হয়েছে। ছোটদের বরং মেলার মাঝখানে রাখতে পারত। আবার নতুন নতুন প্রকাশক যাদের স্থান দিয়েছে তাদের এমন জায়গায় স্টল দিয়েছে যেন শাস্তি। এত বেশি ফাঁকা ফাঁকা হয়েছে যে, একজন মানুষের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে হেঁটে আসতে খুব কষ্ট হবে।

এই প্রকাশক আরও বলেন, প্যাভিলিয়ন যদি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়া হতো তাহলে ভালো হতো। কর্র্তৃপক্ষ প্যাভিলিয়নগুলোকে মেলার মাঝখানে রাখে। এ কারণে ওইখানে সবাই যায়। অন্য স্টলগুলো ফাঁকা থাকে।

খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ :

প্রকাশক নেতা আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, আগে যে কাগজ ছিল ২০-২৫ টাকা ফর্মা, সেটা এখন ৩০-৩৫ টাকা। কাগজের দাম বাড়তি। করোনার আগে কাগজের দাম ছিল রিমপ্রতি ১৬০০-১৭০০ টাকা, গল্পের বই ছাপা হয় এমন এক রিম ৭০ গ্রামের কাগজ এখন ৩১০০ ও ৮০ গ্রামের কাগজ ৩৩০০ টাকা। পাঠকের কথা মাথায় রেখে প্রকাশকরা বইয়ের দাম সেভাবে বাড়াননি। কাগজের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ, কিন্তু বইয়ের দাম বেড়েছে ২৫-৩০ শতাংশ।

গফুর হোসেন বলেন, কাগজের সংকট আছে। বইমেলা আসার আগেই কাগজের দাম রিমপ্রতি ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে। আমরা যে বই ছাপাই সেই কাগজটা যদি তিন-চার মাসের পুরনো হয় তাহলে ছাপাটা ভালো হয়। এখন যে কাগজ পাচ্ছি সেই কাগজ দিয়ে আমাদের ছাপতে কষ্ট হচ্ছে। ছাপা বাঁধাই কালি এগুলোর দামও বেড়ে গেছে। কিন্তু আমরা ফর্মা অনুযায়ী দাম বাড়াতে পারছি না। কারণ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ করতে হলে বইয়ের বিকল্প নেই। দেশে পাঠক নেই, পাঠভ্যাস ছুটে গেছে। ছেলেমেয়েদের বইমুখী করতে হলে বেশি দাম রাখি তাহলে পাঠক তৈরি করতে পারব না।

প্রকাশনা সংস্থা বাবুইয়ের প্রকাশক কাদের বাবু বলেন, কাগজের দাম অনেক বেশি। এতে বইয়ের মূল্য বেশি হয়ে যাবে। অন্যান্য পণ্যের মতো কাগজেও সরকারের ভর্তুকি দেওয়া উচিত।

মিশ্রভাবে মেলা শুরু:

মেলায় অংশ নিয়েছেন আল-হামরা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী তরুণ প্রকাশক খান মুহাম্মদ মুরসালিন। ১৯৪৮ সালে এ প্রকাশনার যাত্রা শুরু। তিনি বলেন, গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যে শ্রেণির প্রকাশকরা প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল, যারা ওই নারেটিভের মূল কুশীলব, তারা এখনো এই বইমেলার মেন স্ট্রিমে রয়ে গেছে। আমরা যারা তরুণ এ গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, আমরা আশা করেছিলাম এই বছর অন্তত ওই নারেটিভার জায়গাটা আমরা বড় একটা স্পেস পাব। কিন্তু বিগত সরকারের যারা অন্যতম ন্যারেটিভের অন্যতম সহায়ক ছিল, তারাই যদি এখনো সেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধি থাকে, এটা একটা দুঃখজনক ব্যাপার। এই বইমেলা শুধু পাঠক-লেখক ও প্রকাশকের মিলনমেলা নয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ইভেন্টগুলোর মধ্যে একটা। এই বইমেলা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে দেশে ও বিদেশে প্রতিনিধিত্ব করে। তারপরও আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়টা ডকুমেন্টেড করা, নথিভুক্ত করা এবং মেরিটিভের জায়গা তৈরি করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। এ মিশ্রভাবে এবারের বইমেলা।

বেড়েছে প্রকাশনা সংস্থা ও স্টল:

গত বছরের তুলনায় এবার মেলায় প্রকাশনা সংস্থা বেড়েছে। গত বছর অংশ নিয়েছিল ৬৪২টি প্রতিষ্ঠান। এবার সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০৮। অর্থাৎ ৬৬টি প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। একইভাবে বেড়েছে ইউনিটের সংখ্যাও। গত বছর ইউনিট ছিল ৯৪৬টি। এবার হয়েছে ১ হাজার ৮৪টি। বেড়েছে ১৩৮টি। প্যাভিলিয়নের সংখ্যা একই রয়েছে, ৩৭টি। 

এবারও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে অংশ নিচ্ছে ১২৭টি প্রতিষ্ঠান ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৫১৫টি।