হোয়াইট হাউজের প্রথম অতিথি নেতানিয়াহু

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:১৬ এএম

দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে চলতি মাসে শপথ নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের আবারও নির্বাচিত হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে ডেমোক্রেটিক সরকারের ভূমিকা। গাজায় এক বছরের বেশি সময় ধরে গণহত্যা চালানোর পরও যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের পরও ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থ ও অস্ত্রের সহায়তা পেয়েছে। জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। এসবের ফলে মুসলিম ভোটারসহ অনেক লিবারেল সমর্থকরা ডেমোক্র্যাটদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তবে ইসরায়েলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের  নীতি পাল্টাচ্ছে না। বরং ইসরায়লের ঘনিষ্ঠ ট্রাম্প তা আর সুসংহত করবেন বলেই মনে হচ্ছে। ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফেরার পর প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে দাওয়াত পাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মঙ্গলবার ইসরায়েলের সরকার নিশ্চিত করেছে যে, ট্রাম্প আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

ঘোষণাটি এমন এক সময় এলো, যার আগের দিন ট্রাম্প গাজার মানুষজনকে জর্দান ও মিসরে স্থানান্তরিত করার প্রস্তাব করেছিলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা এই প্রস্তাবকে জাতিগত গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর আগে, ট্রাম্প গাজায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য কৃতিত্ব নিয়েছেন, যা তার অভিষেকের আগের দিন কার্যকর হয়েছিল। চুক্তিটি এখন পর্যন্ত যুদ্ধের অস্থায়ী সমাপ্তি এবং সাত ইসরায়েলি বন্দি এবং শত শত ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে। এই বিরতিটি কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিকে উত্তর গাজায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনও লেবাননে যুদ্ধবিরতির একটি বর্ধিতকরণের মধ্যস্থতা করেছে, যা কার্যকরভাবে দেশ থেকে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের পিছিয়ে দিয়েছে। এই প্রত্যাহার জানুয়ারির ২৭ তারিখ হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন পিছিয়ে ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধবিরতির চুক্তি হলেও এই অঞ্চলে উত্তেজনা চলছে, গাজা এবং লেবানন উভয় ক্ষেত্রেই নতুন করে লড়াইয়ের ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে নেতানিয়াহু নিয়মিত যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছিলেন যে, তিনি ‘আস্থাবান নন’ যে চুক্তিটি থাকবে ‘এটা আমাদের যুদ্ধ নয়; এটা তাদের যুদ্ধ,’ সাংবাদিকদের বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে।

ট্রাম্প তার প্রথম ডিক্রির একটিতে মিসর ও ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা ছাড়া প্রায় সব আন্তর্জাতিক সাহায্য বন্ধ করে দেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইসরায়েলে ৯০০ কেজি (২০০০ পাউন্ড) বোমা স্থানান্তরের অনুমোদনও দিয়েছেন, যা গত বছরের মে মাসে তার পূর্বসূরি, প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন স্থগিত করেছিলেন। নেতানিয়াহু, যাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, তিনি ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বলেছেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ইসরায়েলকে আত্মরক্ষার জন্য, আমাদের সাধারণ শত্রুদের মোকাবিলা করতে এবং শান্তি ও সমৃদ্ধির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়ার জন্য আপনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য।’ নেতানিয়াহুকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানানো চিঠিতে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন ‘আমরা কীভাবে ইসরায়েল এবং এর প্রতিবেশীদের মধ্যে শান্তি আনতে পারি এবং আমাদের ভাগ করা প্রতিপক্ষদের মোকাবিলা করার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করতে পারি’?

ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর একটি শীতল ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল, কিন্তু ইসরায়েল এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের অভিষেকের আগের দিন হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যে জিম্মির জন্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনার আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ কথোপকথন করেছিলেন বলে জানা গেছে। তারপর থেকে, ট্রাম্প ইসরায়েলকে বোমা সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন। ট্রাম্প গত সপ্তাহের শেষের দিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, গাজা স্ট্রিপকে ‘শুধুমাত্র পরিষ্কার’ করা যেতে পারে এবং ১৫ লাখেরও বেশি লোককে অন্যান্য আরব দেশে পাঠানো হবে, যা এই অঞ্চলের জাতিগত নির্মূলের পরিকল্পনাকে প্রতিফলিত করে বলে মনে হয়। নেতানিয়াহুকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার এবং ‘যুদ্ধের পদ্ধতি হিসাবে অনাহার’ ব্যবহার করার দায় বহন করার জন্য অভিযুক্ত করেছে, যা ২০২২ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের অভিযানের পরে প্রায় ১২০০ ইসরায়েলিকে হত্যা করে এবং কয়েকশকে জিম্মি করে। আবার আইসিসির ১২০টিরও বেশি সদস্য দেশ নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করবে, যদি তিনি তাদের ভূখণ্ডে পা রাখেন। এই দেশগুলোর অনেকটির অবস্থান ইউরোপে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিতে সম্মত হয়নি বরং রিপাবলিকানরা নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের হুলিয়ার বিরুদ্ধে আইন করেছে রিপাবলিকানরা।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আসন্ন বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যর জন্য অশনিসংকেত। ট্রাম্প নিশ্চিত ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, ইসরায়েলের সঙ্গে তিনি আরও গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলবেন। সামনের দিনে গাজাসহ বিশ্বমানবতাকে হয়তো আরও কঠিন এবং যুদ্ধংদেহী অবস্থা মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে হবে।

লেখক :  সাংবাদিক ও অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত