এক. অনেক হিসাব উল্টে গেছে দেশ-বিদেশের রাজনীতিতে। প্রকৃতি বৈরী হয়ে উঠেছে। দাবানলে পুড়েছে আমেরিকা। ভূমিকম্প হানা দিচ্ছে নানা দেশে। রাজনীতিতেও যেন ভূমিকম্পের ছোবল। আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনকালের ইতি হয়েছে। কেউ ধারণা করতে পারেননি, ৫ আগস্ট এত বড় একটা পরিবর্তন হবে দেশে। শেখ হাসিনার শাসনকাল-উত্তর দেশে এখন নতুন রাজনৈতিক হাওয়া। যে হাওয়ায় ‘সংস্কার’ কথাটি জোরেশোরে ভেসে বেড়াচ্ছে। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পরিবর্তন আনছে নানা ক্ষেত্রে। সংবিধান, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য গঠিত হয়েছে কমিশন। প্রাথমিক রিপোর্টও জমা পড়েছে। সংস্কার হচ্ছে পুলিশে। পুলিশ-র্যাব-আনসারের পোশাকে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-সাংসদদের অনেকেই জেলে। ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হচ্ছে। রাজনীতিতে হতে যাচ্ছে নতুন মেরুকরণ।
অন্যদিকে বিশ্বরাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া। সেখানে হয়েছে বড় ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকম্প। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিকত্ব প্রথা বাতিল করেছেন। যদিও আদালত পরবর্তীকালে সে আদেশ স্থগিত করেছে। দুই দেশ ছাড়া অন্যসব দেশে আমেরিকার বৈদেশিক সহায়তা স্থগিত করা হয়েছে। সংগতকারণেই এর কম্পন এসে পড়েছে বাংলাদেশে। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সহায়তা অব্যাহত থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমেরিকার বৈদেশিক সহায়তা স্থগিতের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য একেবারেই অপ্রত্যাশিত। বাংলাদেশকে সর্বশেষ ২০ কোটি ডলারের বেশি উন্নয়ন সহযোগিতার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ইউএসএআইডি) চুক্তি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই চুক্তি হয়। আমেরিকার বৈদেশিক সহায়তা আসলে কত দিন স্থগিত থাকবে, তা বলা মুশকিল। রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে ওয়াশিংটন বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। বিগত কয়েক বছরে মার্কিন সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষ ১০-এর মধ্যে তা ছিল। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সাহায্যের জন্য ৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে, যা বিশে^ সর্বোচ্চ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘ফরেন অ্যাসিস্ট্যান্স ডট গভ’ ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্নভাবে বাংলাদেশে ২০২১ সালে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে ৪৭০ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালের ৪৯০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪ সালে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। হঠাৎ করে আর্থিক সহযোগিতা বন্ধ হওয়া মানেই, বড় ধরনের অর্থনৈতিক ভূমিকম্প। এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকলে ইউক্রেন সংকট হতো না। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর পদত্যাগের পর সেখানেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া। এ অবস্থায় কখন কোন দেশে, কী পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ভূমিকম্প হয়, তা অনুমান করা কঠিন।
দুই. সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশ এখন কোনোমতেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ গত ৮০-৮১ বছরে বড় ভূমিকম্প হয়নি। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান প্লেট যাচ্ছে উত্তর দিকে, আর উত্তর দিকে আমাদের ইউরেশিয়ান প্লেট। দুটি প্লেট ধাক্কা দিচ্ছে, তাতে করে এর বাউন্ডারিতে এনার্জি স্টোর হচ্ছে। কিছুদিন পরপর প্রেশার রিলিজ করার জন্য জায়গাটি নড়ে যায়, আর তখনই ভূমিকম্প হয়। জানা গেছে, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা লক্ষাধিক। একই সঙ্গে পাশের দেশগুলোতে ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট ভূকম্পনেও বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলেও বিশ্লেষকরা বলছেন। এ ক্ষেত্রে নতুন ভবন নির্মাণে সরকারি তদারকি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, সাড়ে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে বাংলাদেশে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। চোখ বন্ধ করে সেই দৃশ্য কল্পনা করলে, কী মনে হয়! আমরা কি স্বাভাবিক থাকতে পারব! রাজধানীতে দিন দিন বাড়ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকার সংখ্যা। অল্প জায়গায় বড় বড় স্থাপনা ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি করা হচ্ছে ভবন। এতে স্বল্পমাত্রার কম্পনেই ভেঙে পড়তে পারে অনেক ভবন। ভেতরে ও বাইরে থেকে ভূমিকম্প সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশ ভয়াবহ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এসব ভূমিকম্পের মধ্যে মাঝারি থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পও রয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত এসব ভূকিম্পে বড় মাত্রার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, না হলেও দেশের চারদিকে ভয়াবহ ভূমিকম্প বলয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব এলাকা থেকে প্রায় সময়ই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে। এর আঘাত সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর। অতীতের মতো সাম্প্রতিককালেও এসব এলাকা থেকে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার নজির রয়েছে। বিশেষ করে সিকিম, উত্তর-পূর্বে আসাম ও এর আশপাশে এলাকা থেকে এখন প্রায়ই ভূমিকম্প সৃষ্টি হচ্ছে। ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে ভূ-অভ্যন্তরে অধিক শক্তি জমা হয়েছে। যেকোনো মুহূর্তের ভূমিকম্পের মাধ্যমে তা বের হয়ে আসবে। এই অবস্থায় সচেতনতা এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশ অনেক দূর অগ্রসর হলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভূমিকম্প মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ভূমিকম্প মোকাবিলায় ব্যাপক প্রচার নেই বললেই চলে। যদিও এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে বড় মাত্রার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবু দেশের চারদিকে কিন্তু ভয়াবহ ভূমিকম্প বলয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর পূর্ব ভারতে বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব এলাকা থেকে প্রায় সময়ই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে। এর আঘাত সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর।
ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার পূর্বাভাস আগে থেকে জানা যায় না। এ ছাড়া একে আটকাবার কোনো পথ নেই। এ অবস্থায় সচেতনতা এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেক দূর অগ্রসর হলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভূমিকম্প মোকাবিলা করার মতো প্রস্তুতিতে আমাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারাভিযান। সরকারি উদ্যোগে ফায়ার সার্ভিস, ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে সব সময় প্রস্তুত রাখতে হবে। নির্মাণাধীন বাড়িগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হচ্ছে কিনা কর্র্তৃপক্ষের সে ব্যাপারে তদারকি জোরদার করতে হবে। উপকূলীয় এলাকা যেখানে সুনামি, ভূমিকম্প সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি, সেখানে তৈরি করতে হবে প্রচুর আশ্রয়কেন্দ্র। কেবল জনসচেতনতাই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি এ দেশের বিশেষজ্ঞরা যেন ভূমিকম্পের ওপর গবেষণা করার সুযোগ পায় এবং ভূমিকম্পের পরিমাণ নির্ণয় করার উপযুক্ত প্রযুক্তি পায়, সে দিকেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে মনোযোগ দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু আমরা প্রকৃতির ওপর অবিচার করে নিজেরাই যেন ভূমিকম্প ডেকে না আনি, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই।
তিন. একটি নগরে সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সে জন্য নগরজীবনকে স্বচ্ছন্দ, পরিবেশবান্ধব, টেকসই, উন্নয়নমুখী এবং পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কেননা দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি মানুষ এখন শহরে বাস করছে। পরিকল্পিত নগর বলতে বোঝায় পরিকল্পিত জনবসতি। যার সবকিছু হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। কিন্তু খোদ রাজধানী পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে নাগরিকদের জীবন আতঙ্কজনক হয়ে ওঠে। জনজীবনকে এটি বিপর্যস্ত করে ফেলে। দুঃখজনক হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় বারবার ঢাকার নাম উঠে আসছে বিভিন্ন জরিপে। আমাদের রাজধানী শহর বসবাসের অনুপযোগী এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! এ অবস্থা যে গৌরবজনক নয়, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি শহরের মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যে নিয়ামকগুলো কাজ করে এর মধ্যে রয়েছে নগরীতে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা, অপরাধের হার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, পরিবেশ, যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোর গুণগতমান, পানি সরবরাহের মান, খাদ্য, পানীয়, ভোক্তাপণ্য এবং সেবা, সরকারি বাসগৃহের প্রাপ্যতা ইত্যাদি। এসব দিক থেকে ঢাকাসহ আমাদের নগরগুলোর কী অবস্থা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ এই শহরে নেই পয়ঃনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট, হাসপাতাল স্কুল-কলেজ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি নাগরিকসেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অথচ রাজধানী ঢাকাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। এ জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। বস্তুত এই শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। যত্রতত্র যে যেখানে পারছে যেকোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এতে নগরী তার বিশিষ্টতা হারাচ্ছে।
চার. রাজনৈতিক ভূমিকম্পের ফলে, আমাদের দেশসহ বিশ্বের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাচ্ছে।
প্রাকৃতিক ভূমিকম্পের ওপর মানুষের হাত নেই। কিন্তু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ভূমিকম্প দূর করতে সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মননশীল, সাংস্কৃতিক বোধসম্পন্ন, দায়িত্বপূর্ণ ও মানবিক নাগরিক হওয়া জরুরি। এই ধরনের ভূমিকম্প দূর করতে হলে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নে পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। অনৈক্য ও অসহিষ্ণুতার পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। থাকতে হবে আত্মোপলব্ধি ও অনুশোচনা বোধ। পরিচয় দিতে হবে দায়িত্বশীলতার। তাহলেই হয়তো প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভূমিকম্প থেকে আমরা রক্ষা পাব।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
