গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ঐকবদ্ধ শিক্ষার্থীদের মাঝে ফাটল দৃশ্যমান হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। ঢাকা কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ, মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, কবি নজরুল কলেজগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগামীতে এমন সংঘাতে না জড়ানোর বার্তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে এক ব্যতিক্রমধর্মী গ্রাফিতি আঁকলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান। ‘প্লিজ কেউ কাউকে ছেড়ে যায়েন না’ শিরোনামে তার এ শিল্পকর্মের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের সংঘাতে না জড়াতে সচেতন করা এবং ঐক্য ধরে রাখা।
আজ বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কলাভবন, শ্যাডো, মধুর ক্যান্টিনসহ বিভিন্ন হলের ভবনের প্রধান ফটক ও দেয়ালে দেয়ালে এই গ্রাফিতি দেখা যায়। গতকাল বুধবার ক্যাম্পাসে এসব গ্রাফিতি আঁকেন বলেন জানান আবিদ।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট সকাল ৯টায় শহীদ মিনারে পুলিশের হামলায় উপস্থিত ছাত্র-জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবার সাউন্ড কানে আসছিল। কোনওরকম রোগী সেজে রিকশা নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের ইমারজেন্সি গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি এবং নতুন বিল্ডিং এর দিকে চলে যাই। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেলের নতুন বিল্ডিং এর পাদদেশে ছাত্র-জনতা একত্রিত হয়ে চানখারপুল এলাকায় কারফিউ ভাঙার প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখি। সে বক্তব্যের কিছু অংশ ছিল, "শুধুমাত্র একটাই কথা, প্লিজ কেউ কাউকে ছেড়ে যায়েন না। এই যুদ্ধের ময়দানে আমাদের সাথে থাকবেন। আমরা এ লড়াইয়ে জিতব কোনও সন্দেহ নেই, আজকেই আমরা জিতব, তবে কেউ ভয় পাবেন না।"
তিনি বলেন, বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস, গুলিকে উপেক্ষা করেই উপস্থিত ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে পড়ি এবং কারফিউ ভাঙি। সে সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজ থামাতে আগুন ধরানো যাচ্ছিল না। বক্তব্য রাখাকালীন যে ছেলেটা অত্যন্ত উজ্জীবিত ছিল, চশমা পরিহিত ২৬ বছরের টগবগে যুবক, মুন্সিগঞ্জ জেলার মিরকাদিম পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব মানিক মিয়া শাহরিক এই বিক্ষোভ থেকে সর্বপ্রথম স্নাইপার আক্রমণে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে এবং লাশ হয়ে মেডিকেলে ফিরে আসে। এভাবেই একে একে আরো নাম না-জানা চারজনকে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে শহীদ হতে দেখি। আহতের সংখ্যা ছিল অসংখ্য। সকলেই কোনও না কোনওভাবে আহত হয়। কেউ বেশি, কেউ কম। সেদিন রাস্তার পাশের বিল্ডিংগুলোতে স্নাইপারের উপস্থিতি ছিল। একদিকে যৌথবাহিনীর বিরামহীন গুলিবর্ষণ অন্যদিকে বিভিন্ন বিল্ডিং থেকে স্নাইপার আক্রমণ। সব মিলিয়ে নিরস্ত্র আমাদের জীবন দিয়েই সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই করতে হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ঐকবদ্ধ মজলুমদের মাঝে ফাটল দৃশ্যমান হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এই ঘটনাগুলো আমাদের চরম হাতাশ করেছে ও পীড়া দিচ্ছে। চোখের সামনে অসংখ্য মৃত্যু দেখেছি, এখন ঐক্য বিনষ্ট হতে দেখছি যা এ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই আজকের এই দিনগুলোতে ৫ আগস্টের সেই "প্লিজ কেউ কাউকে ছেড়ে যায়েন না" এই আহবানটা প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। এই লাইনটার সঙ্গে ৫ জন শহীদ ও অসংখ্য আহতের রক্ত জড়িয়ে আছে। এই লাইনটা যেন আমাদের এখনও আহ্বান করছে ঐক্যবদ্ধ হতে, ঘৃণা চর্চা বন্ধ করতে এবং একটি স্থিতিশীল নতুন বাংলাদেশ গড়তে। সেই ঐক্যের প্রতীক হিসেবে গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তে ভেজা এই লাইনটুকু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও অনুষদে অঙ্কিত হয়েছে।