সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের পর দেশটিতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিতই ছিল। বাকি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার। আসাদ সরকারের পতনের প্রায় দুই মাস পর আহমেদ আল শারাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়া সামরিক কমান্ড বুধবার এ ঘোষণা দেয়। সেই সঙ্গে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে বাশার আল আসাদের আরব সমাজতান্ত্রিক বাথ পার্টিকে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে ছয় দশকের বেশি সময়ের আধিপত্যের সমাপ্তি ঘটল। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কাগজে-কলমে সমাজতন্ত্রের পতন হলো। এদিকে, সিরিয়ায় সামরিক ঘাঁটি রাখার শর্ত হিসেবে বাশার আল আসাদকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছে নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা।
বাথ পার্টির ইতিহাস ও বিলুপ্তি : সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করার পাশাপাশি নিজের জনগণের জন্য সমাজতন্ত্র কায়েম করাটাই বাথ পার্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল। অবশ্য বাথ পার্টি অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল। বাথিস্টরা সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে ইসলামি ধাঁচে মোড়ানো মতবাদ নিয়ে নিজেদের ঝাণ্ডা তুলে ধরেছিল। তবে দলটির মধ্যে বিভক্তিও ছিল প্রবল। সিরিয়ার দুই আরব জাতীয়তাবাদী মিশেল আফলাক এবং সালাহ আল দিন আল বিতার দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। যার লক্ষ্য ছিল আরব রাষ্ট্রগুলোকে এক জাতিতে পরিণত করা। ১৯৪৭ সালে দলের প্রথম নীতিমালা গৃহীত হয়েছিল। এক সময় দলটি দুটি আরব দেশ ইরাক এবং সিরিয়া শাসন করেছিল। বাথ পার্টি বাশার আল আসাদের পরিবারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েই বাশার আল আসাদের আরব সমাজতান্ত্রিক বাথ পার্টি বিলুপ্ত করেছেন আল শারা। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ছয় দশক ধরে দলটিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে আসাদ পরিবার।
নতুন ঘোষণায় কী রয়েছে : সামরিক কমান্ডের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার বরাতে বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী পর্যায়ে দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন শারা। নির্বাচনের আগপর্যন্ত দেশ পরিচালনার জন্য একটি অস্থায়ী আইন পরিষদ গঠনের ক্ষমতা পেয়েছেন তিনি। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে সিরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করবেন শারা। গত বছর আসাদের শাসনামলে যে পার্লামেন্ট নির্বাচিত হয়েছিল সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সিরিয়ার সংবিধান স্থগিত করা হয়েছে এবং নতুন সংবিধানের খসড়া চূড়ান্তের কাজ চলছে। নতুন সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগপর্যন্ত আইন পরিষদ কার্যকর থাকবে। সেই সঙ্গে সিরিয়ার সেনাবাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী এমনকি আল শারার নিজের সশস্ত্র সংগঠন হায়াত তাহরির আল শামসহ (এইচটিএস) সিরিয়ার সব সামরিক গোষ্ঠী বিলুপ্ত করা হয়েছে। যে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ১৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে লড়াই করেছে তাদের রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আহমেদ আল শারার পরিচয় : সিরিয়ার স্বৈরশাসক আসাদকে উৎখাতে চালানো অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া উগ্র ইসলামপন্থি হায়াত তাহরির আল শামের প্রধান নেতা আল শারা। তিনি আগে মোহাম্মদ আল জোলানি নামে পরিচিত ছিলেন। গোষ্ঠীটি সিরিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়ে গত ডিসেম্বরে বাশারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের অভিযানে নেতৃত্ব দেয়। এইচটিএস এক সময় আল-কায়েদার অধিভুক্ত ছিল। তবে ২০১৬ সালে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গোষ্ঠীটি নিজেদের মধ্যপন্থি করার চেষ্টা করেছে। বাশার আল আসাদের পতনের পর কার্যত সিরিয়ার ক্ষমতাসীন দলে পরিণত হয়েছে এইচটিএস।
সম্ভাব্য নির্বাচন : সিরিয়ায় সহসাই জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন নতুন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, যোগ্য ভোটার সংখ্যা নিরূপণের জন্য একটি নতুন আদমশুমারি করা প্রয়োজন। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে নির্বাচনের আয়োজন করতে চার বছরের মতো সময় লাগতে পারে বলে জানান আল শারা। সামরিক কমান্ডের সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, সিরিয়ায় প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে বৈধ ও আইনি পথে সরকারের শূন্যতা পূরণ করা। ট্রানজিশনাল জাস্টিসের মাধ্যমে নাগরিকদের শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিশোধের চিন্তা বাদ দিয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
রাশিয়ার প্রতি আহ্বান :সিরিয়ার সামরিক ঘাঁটি রাখার শর্ত হিসেবে বাশার আল আসাদকে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা। তবে এ দাবির বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে মস্কো। গত মঙ্গলবার একটি উচ্চপর্যায়ের রুশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানান সিরিয়ার নতুন কার্যনির্বাহী নেতা আহমেদ আল শারা।