যথারীতি উষ্ণ শীতকালে শেষ হচ্ছে শীত মৌসুম। এতই উষ্ণ ছিল যে গত ১৬ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে এবারের শীতে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছিল। এরপর থেকে জানুয়ারিতে তাপমাত্রার পারদ আর বাড়েনি, ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি সৈয়দপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল।
কিন্তু দেশের শীতলতম মাসখ্যাত জানুয়ারিতে এবার গত ১০ জানুয়ারি তেতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০০৯ সালের পর জানুয়ারিতে দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি নির্দেশ করছে।
আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ২৮ জানুয়ারিতে তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছিল। এর আগে ২০২৩ সালে ৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে শ্রীমঙ্গলে ২০ জানুয়ারি, ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি তেঁতুলিয়ায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২১ সালে রংপুর বিভাগের রাজারহাটে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত সময়ে দেশের ৪৬ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম তাপমাত্রাও রেকর্ড হয়েছে। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি সৈয়দপুরে ২ দশমিক ৯ এবং একই এলাকায় ২০১৩ সালে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার পারদ নেমে গিয়েছিল।
কিন্তু আবহাওয়ায় এই পরিবর্তন কেন? গত কয়েক বছর যেখানে বেশি শীত পড়েছে। গত বছর একটানা ২৩ দিন শৈত্যপ্রবাহ ছিল দেশ জুড়ে। এবার হঠাৎ করে তাপমাত্রার পারদ বেশি বেড়ে গেল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইলে দেশ সেরা আবহাওয়াবিদরা তিনটি কারণকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তাদের মতে বৃষ্টিপাত না হওয়া, পশ্চিমা লঘুচাপ সক্রিয় না থাকা, বাতাসে ধুলিকণার পরিমাণ কম থাকা এবং সাগরে একাধিক লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার জন্য এবার কাক্সিক্ষত শীতের দেখা পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগেকার সময়ে শীতকালে বৃষ্টি হতো। কিন্তু এবার শীতে বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায়নি। আর বৃষ্টি না হলে শীতের তীব্রতা থাকবে না। যথারীতি এটাই এবার প্রমাণিত হলো।’
বৃষ্টি না হওয়ার কারণ কী? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে দেশের ৪৩ বছরের উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করে ‘চেঞ্জেস ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করা আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, ‘পশ্চিমা লঘুচাপ সক্রিয় না থাকায় এবার বৃষ্টি হয়নি। ভূমধ্যসাগর ও কাস্পিয়ান সাগর থেকে আসা পশ্চিমা বায়ু ইরান, আফগানিস্তান, দিল্লি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে থাকে। কিন্তু এবার এই বাতাস অনেক ওপরে অবস্থান করেছে ভূপৃষ্ঠের ১২ হাজার ফুট উচ্চতার মধ্যে অনুকূল পরিবেশ না পাওয়ায় এই শীতল বাতাস নিচে নামতে পারেনি। ফলে বৃষ্টি যেমন হয়নি, তেমনি বাতাসে কুয়াশার ঘনত্বও এবার কম ছিল।’
তিনি আরও বলেন, এবারের শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে একাধিক লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এসব লঘুচাপের কারণে পশ্চিমা লঘুচাপ আমাদের দিকে আসার অনুকূল পরিবেশ পায়নি। যথারীতি এর প্রভব পড়েছে বাংলাদেশসহ পুরো ভারতীয় অঞ্চলে।
এই দুই আবহাওয়াবিদের সঙ্গে আরেকটা মত যুক্ত করেন আবহাওয়াবিদ ওমর ফারক। তিনি বলেন, বাতাসে ধুলিকণার পরিমাণ বেশি থাকলে সেই বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে। কিন্তু এবার বাতাসে ধুলিকণার পরিমাণ হয়তো কম ছিল। উন্নয়ন কার্যক্রম কমে যাওয়ার কারণেও এমনটি হতে পারে।
এদিকে এবার যে উষ্ণ শীতকাল বিরাজ করতে পারে তা দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ১ জানুয়ারিতে ‘জানুয়ারিও কি ডিসেম্বরের পথে’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এর আগে গত ডিসেম্বরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্বাভাবিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। তখনই ধারণা করা হয়েছিল, এবারের জানুয়ারি মাসও একই পথে ধাবিত হচ্ছে। আর মাস শেষে তিন ধাপে তিনটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হলেও দেশ জুড়ে শীতের তীব্রতা তেমন দেখা যায়নি। একইভাবে কুয়াশার চাদরও দীর্ঘতর ছিল না। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় শীতের তীব্রতা বেশি অনুভব হলেও তা মাত্রাতিরিক্ত ছিল না।
কোনো অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যদি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন ওই এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। আর যদি তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় তখন ওই এলাকায় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে তখন তীব্র শৈত্যপ্রবাহ প্রবাহিত হয়ে থাকে। দেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হলেও জানুয়ারিতে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। এ সময়ে সাধারণত উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শীতল বাতাস প্রবেশ করে।