আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য কমাতে বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা আগেই জানিয়েছিল উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকস। তবে জোটটির এমন পরিকল্পনার বিষয়ে ফের হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, বাণিজ্যিক লেনদেনে ব্রিকস যদি অন্য কোনো মুদ্রাকে সামনে আনতে চায়, তাহলে তাদের রপ্তানিতে শতভাগ শুল্ক আরোপ করা হবে। তিনি আরও বলেন, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো ডলারকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করবে আর যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নেবে না এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।
দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে চায় ব্রিকস। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা মিলে গড়া জোট ব্রিকসের সদস্যভুক্ত দেশের সংখ্যা এখন ১০টি। সর্বশেষ জোটটিতে যোগ দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। গত বছর অক্টোবরে ব্রিকসের বৈঠকে সদস্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে অন্য মুদ্রা ব্যবহারে জোর দেয়। তখনো ব্রিকসকে একই হুঁশিয়ারি জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, আপাতদৃষ্টিতে বৈরী এ দেশগুলোর কাছ থেকে আমাদের প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে যেন তারা নতুন ব্রিকস মুদ্রা সৃষ্টি না করে, কিংবা এমন কোনো মুদ্রাকে পৃষ্ঠপোষকতা না দেয়, যেটা শক্তিশালী ডলারের জায়গা নিতে পারে। তা না হলে তাদের ১০০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রির আশা ছেড়ে দিতে হবে। এ সময় ট্রাম্প আরও বলেন, ব্রিকস আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বা অন্য কোথাও ডলারকে প্রতিস্থাপিত করতে পারবে এমন কোনো সম্ভাবনাই নেই। যেসব দেশ এ ধরনের চেষ্টা করবে তাদের শুল্ককে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদায় বলতে হবে বলে নিজের পোস্টে লেখেন ট্রাম্প।
ব্রিকসের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সাঁড়াশি আক্রমণের পর মস্কোর ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞায় এ তৎপরতা আরও জোরদার হয়। সদস্য দেশগুলো ডলারের পরিবর্তে নিজ নিজ মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত অক্টোবরে রাশিয়ার কাজানে জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া সর্বশেষ বৈঠকে বিকল্প মুদ্রার পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ১৬তম শীর্ষ সম্মেলন যোগ দিয়েছিলেন ৩৬টি দেশের শীর্ষ নেতারা। পাশাপাশি জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ন্যাটো সদস্য তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদার থাইল্যান্ড ও মেক্সিকো এবং বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়াসহ প্রায় তিন ডজন দেশ যোগদানের জন্য আবেদন করেছে। সম্মেলনে গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্ব দক্ষিণের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করা এবং বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে পশ্চিমাদের বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য ব্রিকসের।
বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে ব্রিকস গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে যদি ব্রিকস গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলো ডলারের পরিবর্তে অন্য কোনো মুদ্রা ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তবে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে ব্রিকস গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া এবং চীন তাদের মুদ্রা ব্যবস্থাকে বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী করতে নানা ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
এদিকে আজ থেকে কানাডা ও মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের আগেই প্রতিবেশী দুই দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শুল্ক আরেপের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। তবে ওই দুই দেশ থেকে আসা তেলের ক্ষেত্রে এ নিয়ম কার্যকর হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানান ট্রাম্প। কানাডা ও মেক্সিকোর পণ্যে এমন শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, তার এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য বিপুলসংখ্যক নথিবিহীন অভিবাসী আসার বিষয়টি সামাল দেওয়া। পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো এ সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। কানাডা-মেক্সিকোর পাশাপাশি চীনা পণ্যেও নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। নির্বাচনী প্রচারকালে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের কথা বলেছিলেন। তবে হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেননি। অবশ্য সে পরিকল্পনা একেবারে বাতিল করেননি বলেও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, চীনা পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ব্যাপারেও তিনি চিন্তাভাবনা করছেন।