অনিরাপদ খাদ্যে বছরে মৃত্যু ৩৫ হাজার

শরীরে পুষ্টি নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নেই। বাংলাদেশে পুষ্টির সমস্যার মূল কারণই হচ্ছে অনিরাপদ খাদ্য। আর এই অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে দেশে প্রতি বছর ৩৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রতিদিন অন্তত ৫ শতাংশ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়।

জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস উপলক্ষে গতকাল রবিবার ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আয়োজিত এক সেমিনারে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

দেশে কীভাবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা হয় তা নিয়ে নানা কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটি উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ ‘খাদ্য হোক নিরাপদ, সুস্থ থাকুক জনগণ।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্পেশালাইজড হাসপাতালের সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য সচিব মো. মাসুদুল হাসান। তিনি বলেন, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা এই তিনটি জিনিসকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একে অন্যের পরিপূরক। সুস্থ থাকতে হলে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে বিশ্বে ৭০০ বিলিয়ন লোকের খাদ্য কত নিরাপদ, আজ সেই প্রশ্নটি জেগেছে।

সভাপতির বক্তব্যে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, সংস্থাটির ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জন্য ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন, খুলনায় নিরাপদ খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দ এবং শিশুদের নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে সচেতন করতে ‘লুডু খেলাঘর’ চালু করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বৃতি দিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে আমাদের দেশে দৈনিক ৮০ জন ও বছরে ৩০ হাজার মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। দেশে খাদ্য নিরাপদের বিষয় নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা কাজ করছি।’

সেমিনারে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদা ইসলাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্বৃতি দিয়ে তিনি বলেন, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে প্রতি ১০ জনে একজন অসুস্থ হয়। অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে বছরে সারা বিশে^ ৪ লাখ ২০ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়, যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে।

খালেদা ইসলাম, ২০২১ সালের বাংলাদেশ খাদ্য ও পুষ্টি ইনস্টিটিউটের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের ঘি-এর মধ্যে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, গুড়ে ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ, মধুতে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, মিষ্টিতে ২৮ দশমিক ৫৭, হলুদে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ডাল/ছোলায় ৫ শতাংশ, চালে ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, মরিচে ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ, গুঁড়ো দুধে ১৬ দশমিক ৬৭ এবং লবণে ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ ভেজাল প্রমাণ হয়েছে।’

তিনি বলেন, শারীরিকভাবে প্রস্তুত করার সময় ছাড়াও বিভিন্নভাবে খাবার দূষিত হতে পারে। খাদ্য বিষাক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ ফরমালিন, ইউরিয়া ও ক্যালসিয়াম কারবাইডের ব্যবহার।

খাবার সংরক্ষণের বিষয়ে খালেদা ইসলাম তার উপস্থাপনায় বলেন, ‘খাবার সংরক্ষণে আলাদা আলাদা তাক ব্যবহার করতে হবে। সঠিক উপায়ে রান্না করতে হবে। সঠিক তাপমাত্রা সংরক্ষণ এবং নিরাপদ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া খাদ্য নিরাপদ রাখতে খাবার পরিষ্কার রাখা, রান্না ও কাঁচা খাবার একসঙ্গে না রাখা, ঢেলে রান্না করা, সঠিক তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ এবং রান্নায় নিরাপদ পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।

বাজার থেকে কী ধরনের খাবার কিনতে হবে জানিয়ে খালেদা ইসলাম বলেন, ‘ফল, শাকসবজি কেনার সময় রঙ ঠিক আছে কি না, তা দেখতে হবে। মৌসুমি ফল, শাকসবজি কিনতে হবে। পচা বা গন্ধযুক্ত খাবার কেনা যাবে না। হাত দিয়ে দেখতে হবে।’ তেলের ব্যবহার সম্পর্কে বলেন, ‘তেলে চর্বির পরিমাণ কতটা সেটা দেখতে হবে।’

সেমিনারে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে খাদ্য পুষ্টিগুণ বজায় রাখা এবং উত্তম পারিবারিক অনুশীলন বজায় রাখতে হবে। সমাজের সুস্বাস্থ্য উন্নয়নে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ খাদ্য শুধুমাত্র রোগ প্রতিরোধেই সহায়ক নয়, এটি শরীরের সঠিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাস, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুল খালেক ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিরাপদ খাদ্য অপরিহার্য : দিবসটি উপলক্ষে গতকাল অনলাইনে ‘উচ্চ রক্তচাপ ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপদ খাদ্য’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারের আয়োজন করে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)। আয়োজনটির সহযোগিতায় ছিল গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)।

ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অভাবে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন ধরনের অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ছে। খাবারে লবণের পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি আঁশযুক্ত খাবার ও পরিমিত পরিমাণে শাকসবজি গ্রহণ করা হলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

বক্তারা আরও বলেন, বিশ্বে প্রতি বছর এক কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এসব মৃত্যুর অধিকাংশই স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক নীতির মতো বিভিন্ন ধরনের নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে-২০২২’-এর তথ্য অনুযায়ী ৩৭ শতাংশ মানুষ খাবারের সঙ্গে লবণ গ্রহণ করে। ১৩ শতাংশ মানুষ মাত্রাতিরিক্ত লবণযুক্ত ফাস্ট ফুড খেয়ে থাকে। এতে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে।

ওয়েবিনারে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ‘আমরা ট্রান্সফ্যাট রেগুলেশন ও লেবেলিং বিধিমালাসহ অন্যান্য আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী সবজি ও বাদামসহ অন্যান্য অপ্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি করে খেতে হবে। একই সঙ্গে লবণ, চিনি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট পরিহার করতে হবে।

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, অতিরিক্ত লবণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও রেড মিট পরিহার করার পাশাপাশি জীবনাচরণে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। সঞ্চালনা করেন প্রজ্ঞার কো-অর্ডিনেটর সাদিয়া গালিবা প্রভা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ওয়েবিনারে অংশ নেন।