লিবিয়ায় উদ্ধার মরদেহের মধ্যে ১০ জনই রাজৈরের

ইতালি পাঠানোর জন্য ১৩ লাখে চুক্তি হলেও ১৬ লাখ টাকা দিয়েও যাওয়া হলো না মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার মুজন্দারকান্দি গ্রামের সুজন হাওলাদারের। সুজনসহ একই উপজেলার ১০ জনের লাশের ছবি দেখে শনাক্ত করেছে তাদের পরিবার। অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে নিহত ২০ জনের মধ্যে এই ১০ জনের পরিচয় মিলেছে। এ নিয়ে নিহতদের পরিবারে চলছে মাতম। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছে আরও চারজন।

এ ঘটনায় জড়িত দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। পুলিশ বলছে, এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিহতদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয়রা জানায়, রাজৈরের পশ্চিম স্বরমঙ্গল গ্রামের চা বিক্রেতা হাসান হাওলাদারের ছেলে টিটু হাওলাদার, গোবিন্দপুরের বাসিন্দা আক্কাস আলী আকনের ছেলে আবুল বাশার আকন, সুন্দিকুড়ি গ্রামের নীল রতন বাড়ৈ, সাগর বাড়ৈ, একই গ্রামের মহেন্দ্র নাথ বিশ্বাসের ছেলে সাগর বিশ্বাস, গোবিন্দপুরের ফিরোজ শেখের ছেলে ইনসান শেখ ও আশিষ কীর্তনীয়া, বৌলগ্রামের নৃপেন কীর্ত্তনীয়ার ছেলে অমল কীর্ত্তনীয়া, একই গ্রামের চিত্ত সরদারের ছেলে অনুপ সরদার, শাখারপাড় গ্রামের সজিব মোল্লা, সাতবাড়িয়ার রাজীব, মুজুন্দারকান্দি গ্রামের ছেলে সুজন হাওলাদারের মরদেহ ছবি থেকে শনাক্ত করেছে তাদের পরিবার। সবার বয়স ২০-৩০ বছরের মধ্যে।

নিখোঁজ চারজন হলেন ওপেন কীর্তনীয়ার ছেলে নিপুণ কীর্তনীয়া (২২), আতাহার বেপারির ছেলে কুদ্দুস বেপারি (৩৩), মন্নান হাওলাদারের ছেলে অহিদুল হাওলাদার (২৫), ইসরাফিল বেপারির ছেলে মারুফ বেপারি (১৬)।

স্বজনরা জানান, দালালদের খপ্পরে পড়ে গত ১ জানুয়ারি ইতালির উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন রাজৈর পৌরসভার পশ্চিম স্বরমঙ্গল গ্রামের টিটু হাওলাদার। তার সঙ্গে মামা গোবিন্দপুরের বাসিন্দা আবুল বাশার আকনও যোগ দেন। গত ২৪ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাত্রা করেন তারা। মাঝপথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান দুজনই। গতকাল সকালে তাদের মৃত্যুর খবর এলে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। এ ঘটনায় রাজৈর উপজেলার ১০ জনসহ ২০ জনের লাশ উদ্ধার করেছে লিবিয়ার কোস্ট গার্ড।

নিহত আবুল বাশারের বাবা আক্কাস আলী আকন বলেন, ‘মনির হাওলাদার ও স্বপন মজুমদার এই দুই দালাল ২৮ লাখ নিয়েছে আমার ছেলেকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে। কিন্তু আমার ছেলের এমন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। এই দালালদের কঠোর বিচার চাই।’

টিটু হাওলদারের চাচাতো ভাই রেজাউল হাওলাদার বলেন, ‘দালালে লোভ দেখাইয়া আমার ভাইকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেবে কখনোই তা ভাবতে পারিনি। দালালের কঠিন বিচার চাই। আর আমার ভাইয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কাছে অনুরোধ করছি।’

সুজন হাওলাদারের স্ত্রী মুন্নি আক্তার বলেন, ‘মনির দালাল ১৩ লাখের কথা বলে ১৬ লাখ নিয়ে আমার স্বামীকে ইতালি নেয় নাই, ইচ্ছা করে এই দালাল নরমাল ও ছোট একটা বোটে কোনো প্রকার লাইফ জ্যাকেট ছাড়া ৪১ জন মানুষকে ইতালির উদ্দেশে সাগরে পাঠায়। সেখানে আমার স্বামী ছাড়াও আমাদের এই এলাকার অনেকেই আছে। আমাদের মনির দালাল বলেছিল, এই বোটে তার বোনের ছেলে থাকবে তাই ভরসা পেয়েছিলাম, কিন্ত সে তার বোনের ছেলেকে এই বোটে দেয় নাই। আমি মনির দালালের কঠিন বিচার চাই।’

মাদারীপুরের রাজৈর থানার ওসি মো. মাসুদ খান বলেন, ‘ইতালি যাওয়ার সময় লিবিয়ায় রাজৈর উপজেলার ১০ যুবক মারা গেছেন বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। নিহতদের পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত ওয়ারেন্টভুক্ত দালালদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়।’

মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহ্ মোহাম্মদ সজীব বলেন, ‘নিহত ১০ জনের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।’

গত বৃহস্পতিবার লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস ফেসবুকে এক পোস্টে জানায়, ‘লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে ব্রেগা উপকূল থেকে বেশ কয়েকজন অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার পর মরদেহগুলো উপকূলে ভেসে আসে।’ দূতাবাস আরও জানায়, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক থাকতে পারেন। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।