অন্যের জমি দখল করে যশোরে ২০ বছর ধরে চলছে একটি কলেজ। মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়েছে অনুমোদন, হয়েছে এমপিওভুক্ত। এ অনিয়মগুলো হয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য রণজিৎ রায় ও তার ছেলে রাজিব রায়ের প্রত্যক্ষ মদদে। জমির মালিক তার সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ঘুরে কোনো ফল না পেয়ে জমি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার পাঠান পাইকপাড়ার চিত্রা মডেল কলেজটি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মাত্র ৩৮.৪৮ শতক জমি নিয়ে কলেজটি যেমন শিক্ষা বোর্ড থেকে পাঠদানের অনুমোদন পেয়েছে, তেমনি মন্ত্রণালয় থেকে হয়েছে এমপিওভুক্ত। অথচ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালায় রয়েছে উচ্চমাধ্যমিক মহাবিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে মফস্বল এলাকায় কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতর ন্যূনতম জমির পরিমাণ এক একর বা একশ শতক হতে হবে।
চিত্রা মডেল কলেজটির ৩৮.৪৮ শতক জমি রয়েছে তাও এক দাগে নয়। কলেজের দুই ভবনের মধ্যে অন্যের জমি, প্রবেশপথ ও মাঠটিও তাদের নয়। এ জমি তাদের দখল করা। এর মধ্যে ৪৪ শতক জমি ওসমান গণি নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির। ২০ বছর ধরে জমি উদ্ধারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।
ওসমান গণির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের আগস্ট মাসে তদন্তের নির্দেশ দেন বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার। সে অনুযায়ী উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নির্দেশনায় খাজুরা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বিএম শাহীন গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আবেদনকারী মো. ওসমান গণি ২২১/৯-১/২০২৬-১৭ নম্বর নামজারি মামলায় সেপারেশনকৃত ৯৭৫ নম্বর খতিয়ানে ৩, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর দাগে মোট ৩৭ শতক জমি নিজ নামে নামজারি করেন। সীমাখালী বাজারের নিকটস্থ যশোর-মাগুরা মহাসড়ক সংলগ্ন চিত্রা মডেল কলেজের অফিস কক্ষ এবং শ্রেণিকক্ষের সম্মুখ বরাবর উক্ত জমির অবস্থান।
কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ জনাব মো. কহিনুর আলম জানান, আবেদনকারী মো. ওসমান গণি সাহেব উল্লিখিত জমিসমূহ কলেজের অনুকূলে হস্তান্তর করবেন তার এমন সম্মতিতে এবং ইচ্ছাতে ২০০৩ সালে উক্ত কলেজটি স্থাপন এবং যাত্রা শুরু করা হয়েছিল।
অবশ্য ওসমান গণির ভাষ্য, তিনি কখনো কলেজকে জমি দিতে চাননি। ১৯৯৯ সালে তিনি জমি কিনেছেন। প্রতিষ্ঠাকালে কলেজের কেউ তার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। বরং তিনি জমির সীমানা দিতে চাইলে তারা বাধা দিয়েছে। এমনকি ২০২১ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য রণজিৎ রায়ের ছেলে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি রাজিব রায়ের নির্দেশে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এ সময় তাকে দিয়ে জোর করে সাদা কাগজে সই করে নেওয়া হয়।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে আন্দোলন ও ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি হয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শোভন সরকার। জমির মালিকদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে তিনি তদন্ত করে জমি নিয়ে জটিলতার কথা জানলেও জমির মালিককে সমাধানের পথ দেখিয়েছেন কলেজের কাছে জমি বিক্রি করে দেওয়ার। কলেজের জমির সংকট সমাধানে উদ্যোগী হয়েছেন তিনিও। কিন্তু সমাধান হয়নি।
তিনি বলেন, জমি দখল আবার দখল নয়। আমরা জমিটি কলেজের কাছে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়ার জন্য জমির মালিক ওসমান গণিকে ডেকেছিলাম। কিন্তু তিনি আসেননি। এরপর আর কোনো পদক্ষেপ নেননি উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এ কারণে জমিটি কলেজের দখলেই রয়েছে গেছে।
বর্তমান সময়ে এসে ক্যাম্পাস পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন কলেজ কর্র্তৃপক্ষ। কিন্তু ফলপ্রসূ কিছুই হয়নি। তাই শেষ পর্যন্ত নিজের কেনা জমি ২০ বছর পরে এসেও দখলে পাবেন না কিনা তাই নিয়ে সংশয়ে জমির মালিকরা।