নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও লিখেছেন প্রচুর। তার গল্প-উপন্যাস যেমন পাঠকপ্রিয় হয়েছে, তেমনই ছোট-বড় সবার কাছে আদৃত হয়েছে শিশুসাহিত্যগুলোও। হুমায়ূন শুধু কথাসাহিত্যেই তার পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছেন তা-ই নয়, চলচ্চিত্র নির্মাণেও রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, নয় নম্বর বিপদ সংকেত প্রভৃতি চলচ্চিত্র দ্বারা সৃষ্টি করেছেন চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা। তবে এ কথা সবচেয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন সম্ভবত নাটক রচনা ও নির্মাণে। বাংলাদেশে টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসে তার সঙ্গে তুলনীয় জনপ্রিয় নাট্যকার ও নির্মাতা এখনো কেউ নেই। ছোটদের জন্য তিনি লিখেছেন নাটকও। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তার লিখিত কিশোর উপযোগী নাটক নিয়ে তেমন আলোচনা বা চর্চা হয় না বললেই চলে। ‘স্মৃতিচিহ্ন’ নামের কিশোর নাটিকাটি তেমনই একটি অসাধারণ কিন্তু উপেক্ষিত হুমায়ূন সাহিত্য।
স্মৃতিচিহ্ন বাবা, মা, ছেলে-মেয়ে চারজনের একটি ছোট্ট সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। আর সব মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই এই পরিবারের রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। পরিবারের প্রতিটি পয়সা হিসেবে করে খরচ করতে হয় তাদের। কিন্তু মানুষের জন্য ভালোবাসা, সহমর্মিতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না এই অর্থসংকট। পরিবারের বড় সন্তান লাবণ্য প্রায়ই অসুখ-বিসুখে ভোগে। এ জন্য শীতকালে মা তাকে শীতবস্ত্র পরতে বিশেষ পীড়াপীড়ি করেন। একদিন দেখতে পেলেন লাবণ্য বারবার বলা সত্ত্বেও খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। নানা বাদানুবাদে জানা যায়, একটি দরিদ্র ছেলেকে শীতে কাঁপতে দেখে তাকে দয়াপরবশ হয়ে দিয়ে দিয়েছে। মা স্বভাবতই রেগে যান এবং শীতে খালি গায়ে থাকার জন্য লাবণ্যকে তিরস্কার করেন। বাবা ফিরে এলে মা তাকে জানান যে, লাবণ্য তার নতুন সোয়েটারটি শীতে কাতর এক দরিদ্র ছেলেকে দিয়ে দিয়েছে। বাবা কিন্তু তাতে একটুও দুঃখিত হলেন না। লাবণ্যকে বকাঝকা করলেন না। বরং বললেন, তাকে আরেকটি সোয়েটার কিনে দেবেন। এতেই বোঝা যায়, লাবণ্যের এই সহৃদয় মনোভাবের উৎস কী। তবে মাও যে, নিষ্ঠুর হৃদয়ের অধিকারী তা নয়। তা হলে, লাবণ্যকে বকাঝকা করতেন। দুঃখের ব্যাপার হলো, বাবা পরদিন আরেকটি সোয়েটার কিনে দিলেও লাবণ্য সেটি বেশিদিন পরতে পারেনি। কারণ জ¦রে পড়ে সে মারা যায়। নাটিকাটি শেষ হয়, হৃদয়বিদারক একটি দৃশ্যের মাধ্যমে। বাবা, মা ও ছেলে টগর আরেক শীতে একসঙ্গে বসে থাকেন। বাবার হাতে কবিতার বই। কিন্তু টগর জানায় তার কবিতা শুনতে ভালো লাগছে না। সে সময় একটি ভিখিরি আসেন এবং শীতের কাপড় চান তার মেয়ের জন্য। বাবা লাবণ্যের সোয়েটারটি দিতে বললেও মা এ স্মৃতিচিহ্নটি দিতে রাজি হন না। তবে ভিখিরির মেয়ের সঙ্গে লাবণ্যের অবিকল মিল দেখে তাকে সোয়েটারটি দিয়ে দেন। হতদরিদ্র মানুষরাও কারও না কারও সন্তান, মা, বাবা, তাদেরও পরিবার আছে আমাদের মতোই। মায়া, মমতা, ভালোবাসার অনুভব আমাদের থেকেও তাদের কম নয়। এই বিশ্বজনীন মমত্ববোধের বাণী প্রকাশ করে শেষ হয় নাটিকাটি। নাটিকাটিতে রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘ডাকঘর’-এর ছায়া বর্তমান থাকলেও অন্তর্নিহিত বক্তব্য, বিষয় প্রভৃতি কারণে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। নাটকটি পড়তে তোমাদের ভালোই লাগবে। নাটকটি হুমায়ূন আহমেদের কিশোর সমগ্র সংকলনের অন্তর্ভুক্ত। কিশোর সমগ্র প্রকাশ করেছে কাকলী প্রকাশনী।
সুলতানা রাজিয়া