রাজধানীর ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর-আগুনের পর দেশ জুড়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপিদের) বাড়ি ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে আওয়ামী লীগের অন্তত ১২ নেতার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়ি ভাঙচুর করতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
নোয়াখালীতে সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের এবং ফেনীতে সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। আর মেহেরপুরের মুজিবনগরে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালসহ স্বাধীনতার বিভিন্ন স্মৃতি স্থাপত্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে খুলনায় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পৈতৃক সম্পত্তিতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত সময়ে এসব ঘটনা ঘটে। বিস্তারিত নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে :
মোজাম্মেলের বাড়ি ভাঙচুর করতে গিয়ে পিটুনিতে আহত ১৫ : গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়ি ভাঙচুর করতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর ধীরাশ্রম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজাম্মেল হকের বাড়িতে শতাধিক জনতা হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে স্থানীয়রা এলাকায় ডাকাত পড়েছে জানিয়ে মাইকিং করে লোকজন জড়ো করে। পরে স্থানীয়রা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করতে যাওয়া জনতাকে ধাওয়া করে। এ সময় তারা বেশ কয়েকজনকে আটক করে বেধড়ক মারধর করে। এদের মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় ১৫ জনকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
গত ৫ আগস্টের পর থেকে মোজাম্মেল হক পলাতক। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল রাত ১২টায় গাজীপুর সদর মেট্রো থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
নোয়াখালীতে মইন ইউ আহমেদের গ্রামের বাড়িতে আগুন : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌরসভার আলীপুরে সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের গ্রামের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। একই সময় পাশের চৌমুহনী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আক্তার হোসেনের বাড়িতেও ভাঙচুর করা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে এসব ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পৃথক দুটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
তবে এ হামলা-ভাঙচুর কিংবা অগ্নিসংযোগের ঘটনার সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন সংগঠনটির নোয়াখালী জেলা শাখার আহ্বায়ক মো. আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, চৌমুহনীর ঘটনাটি সেখানকার স্থানীয় রাজনৈতিক ঘটনা।
পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে হামলাকারীদের কাউকে পাননি। এ ঘটনার পর রাতে চৌমুহনী পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সেনাবাহিনী ও পুলিশকে টহল দিতে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
হাতিয়ায় সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর বাড়িতে আগুন : নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলীর বাসায় ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করেছে ছাত্র-জনতা। বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে হাতিয়া পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এমপির পোলসংলগ্ন বাসা ও ব্রিকফিল্ড বাজার বাসায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া রাত ৩টার দিকে উপজেলার নলচিরা ঘাটে থাকা মোহাম্মদ আলীর মালিকানাধীন চারটি বোটেও আগুন ধরিয়ে দেয় সেখানকার বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। গতকাল সকালেও মোহাম্মদ আলীর দুটি বাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এলাকাবাসী জানায়, রাত ১১টার দিকে ছাত্র-জনতার ব্যানারে মিছিল নিয়ে মোহাম্মদ আলীর বাসার দিকে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা ও প্রতিবেশীরা তাদের গতিরোধ করে। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। হামলাকারীদের প্রথমে তাড়িয়ে দেওয়ার পর এলাকাবাসী যে যার বাড়িতে চলে যায়। পরে রাত ২টার দিকে হামলাকারীরা আবার দল বেঁধে এসে মোহাম্মদ আলীর বাসায় ভাঙচুর ও আগুন লাগিয়ে দেয়।
সিরাজগঞ্জে সাবেক এমপি প্রয়াত স্বপনের বাড়িতে আগুন : সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের সাবেক এমপি আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত হাসিবুর রহমান স্বপনের দুটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। বৃহস্পতিবার রাতে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের পুনর্বাসন এলাকার বাড়ি দুটিতে হামলার এ ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, ২০১৩ সালে সয়দাবাদ ইউনিয়নের পুনর্বাসন এলাকায় স্বপনের দুটি বাড়ি তৈরি করে ভাড়া দিয়ে রেখেছিলেন।
রাজশাহীতে সাবেক মেয়র লিটনের বাড়ি ভাঙচুর : রাজশাহীতে দ্বিতীয় দফায় ভাঙচুর করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বাসভবন। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার পর থেকে একটি বুলডোজার দিয়ে বাড়িটি ভেঙে ফেলতে কাজ শুরু হয়। গভীর রাত পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলে। এর আগে ৫ আগস্ট এ ভবনটি ভাঙচুর শেষে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। লিটনের তিনতলা বাড়িটি রাজশাহী নগরের উপশহরে।
বগুড়ায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আ.লীগ, জাপা ও জাসদ অফিস : বুলডোজার দিয়ে বগুড়া শহরের সাতমাথার টেম্পল সড়কে জেলা আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জাসদের অফিস গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলে। দলীয় কার্যালয়গুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরপরই উৎসুক জনতা ও ছিন্নমূল মানুষরা ইট, রড, লোহা, চেয়ার, পাইপসহ যে যা পেয়েছে, তা নিয়ে চলে যায়।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ চৌধুরীর বাড়িতে আগুন : ফেনীর সোনাগাজীতে সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রামের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে উপজেলার সুলাখালী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এলাকাবাসী জানায়, রাতে একদল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি মিছিল নিয়ে মাসুদ চৌধুরী বাড়িতে ঢুকে তিনটি বসতঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে বসতঘরের আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে হামলাকারীরা সরে যায়। ওয়ান ইলেভেনের অন্যতম কুশীলবখ্যাত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে ফেনী-৩ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। একই আসন থেকে ২০২৪ সালেও তিনি এমপি হন। সোনাগাজীতে বিএনপির সভায় একাধিক বক্তা তার শাস্তি দাবি করে জোরালো বক্তব্য দেন। মাসুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র হত্যার অভিযোগে মামলা রয়েছে।
এদিকে এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও আমিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুল হক হিরনের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। তিনি ফেনীর সাবেক এমপি নিজাম হাজারীর মামাতো ভাই। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এলাকা ছেড়ে পালিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যান।
কেরানীগঞ্জে আ.লীগের কয়েক নেতার বাড়িতে হামলা : ঢাকার কেরানীগঞ্জে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুজিবুর রহমান, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি মাহমুদ আলম, আগানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মীর আসাদ হোসেন টিটু, থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ মিঠু ও জিনজিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাকুর হোসেন সাকুর বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে শুরু করে রাত ১১টা পর্যন্ত হামলার এসব ঘটনা ঘটে।
গাইবান্ধায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আ.লীগ কার্যালয় : গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। পরে কার্যালয়টি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত শহরের রেলগেটে এ ঘটনা ঘটে। গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে কার্যালয়টি জানালা-দরজাসহ সবকিছু লুট হয়। এরপর ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে শহরের থানা পাড়ায় জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ আহসান হাবিব রাজিবের বাড়িতে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুর করে।
খুলনায় শেখ হাসিনা-রেহানার গোডাউন ভাঙচুর : খুলনার দিঘলিয়ার নগরঘাট এলাকায় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পৈতৃক সম্পত্তিতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে মুসলিম লীগের নেতা খান এ সবুর দিঘলিয়ায় ভৈরব নদীর পাশে নগরঘাট এলাকায় ১ একর ৪৪ শতক (৪ বিঘা) জমি হেবা দলিলের মাধ্যমে দান করেন। পরে ওই জমিতে পাটগুদাম করা হয়। জমিটি দেখাশোনা করতেন শেখ মুজিবের ছোট ভাই শেখ আবু নাসের। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর জমিটি প্রায় পরিত্যক্ত ছিল।
মুজিবনগরে আবারও ভাঙা হলো ম্যুরালসহ নানা স্থাপত্য : মেহেরপুরের মুজিবনগরে শেখ মুজিবের ম্যুরালসহ স্বাধীনতার বিভিন্ন স্মৃতি স্থাপত্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, কারা এসব ভেঙেছে তা জানা যায়নি। কারা করেছে সেটা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের পাশের এলাকার বাসিন্দা আলী আকবর জানান, গতকাল ভোরের দিকে ২০-২৫ যুবক স্মৃতিসৌধের ভেতরে ঢুকে হামলা চালায়। ওই যুবকদের প্রত্যেকের হাতে হাতুড়ি ও শাবল ছিল। এর আগে ৫ আগস্ট রাতে মুজিবনগরে একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটিয়ে সবকিছু ভাঙচুর করা হয়েছিল। পরে সেগুলো সংস্কার করা হলেও আবারও ভেঙে ফেলা হলো সেগুলো।
এ বিষয়ে মুজিবনগর থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘সকালে স্থানীয়রা খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ম্যুরাল ভেঙে ফেলার দৃশ্য দেখতে পায়। পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কারা, তা খতিয়ে দেখছে।’