ইসির আপত্তি রেখেই সুপারিশ কমিশনের

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের বেশ কয়েকটি সুপারিশ নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। বিশেষ করে ইসির বিষয়ে তদন্তভার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির হাতে দিলে ইসির স্বাধীনতা ‘খর্ব হবে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। এসব আপত্তি রেখেই সংস্কারের জন্য সুপারিশ করেছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন।

সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশনের দায়বদ্ধতা অংশের সুপারিশে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনারদের পারিশ্রমিক ও কমিশনের সাচিবিক ব্যয়ের পাশাপাশি কমিশনের সব নির্বাচন-সংক্রান্ত ব্যয় প্রজাতন্ত্রের সংযুক্ত তহবিলে দায়যুক্ত করা। নির্বাচন কমিশনের আইনি, আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রস্তাব কোনো মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে প্রস্তাবিত সংসদীয় কমিটির কাছে উপস্থাপনের বিধান করা। প্রস্তাবিত নির্বাচন কমিশন আইন-২০২৫-এ কমিশনারদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, আর্থিক অনিয়ম ও শপথ ভঙ্গের কারণে স্পিকারের নেতৃত্বে সংসদের উচ্চকক্ষের একটি সর্বদলীয় বিশেষ সংসদীয় কমিটিকে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো।

এ ছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২-এর ধারা সংশোধনপূর্বক নির্বাচনী অপরাধের মামলা দায়েরের সময়সীমা রহিত করা। এবং একটি ‘বিশেষ তদন্ত কমিশন’ গঠনের মাধ্যমে ২০১৮ সালের জালিয়াতির নির্বাচনের দায় নিরূপণ করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারকদের আওতায় আনা। প্রস্তাবিত কমিশনের কার্যপরিধি অন্যান্য নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রসারিত করা, একই সঙ্গে আদালতের সঙ্গে জালিয়াতির মাধ্যমে যারা রায় বদলিয়ে দিয়ে আমাদের নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা। 

ইসির দায়বদ্ধতা অংশে বলা হয়, গণতান্ত্রিক শাসনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো নজরদারিত্ব। বস্তুত আধুনিক রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হলো এ নজরদারিত্বের ভূমিকা পালনের জন্য ‘পাহারাদার’ সৃষ্টি। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো যে তিনটি প্রায় ‘কো-ইকোয়েল’ বা সমগুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিভক্ত নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ তার অন্যতম লক্ষ্যই হলো ক্ষমতার বিভাজন করে একটি নজরদারিত্বের কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে কোনো একটি বিভাগ বাড়াবাড়ি বা অন্যায় করে পার পেয়ে যেতে না পারে। এমনি নজরদারিত্বের কাঠামোতে প্রতিটি বিভাগের বাড়াবাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখতে, এমনকি বিহিত করতে পারে অন্য দুটি বিভাগ। যেমন, নির্বাহী বিভাগ ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাতে পার পেয়ে যেতে না পারে, তার প্রতিকারের ক্ষমতা রয়েছে আইনসভা ও বিচার বিভাগের কাছে।

এতে আরও বলা হয়, এ ধরনের নজরদারিত্বের কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো নাগরিকের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ। ক্ষমতার বিভাজন তথা নজরদারিত্বের এ কাঠামো ভেঙে যাওয়ার ফলেই বাংলাদেশে দেশে স্বৈরতন্ত্রের উদ্ভব ঘটেছে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ বছরে দানবে পরিণত হয়।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানে ‘নির্বাচন’ শীর্ষক সপ্তম ভাগের ১১৮ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। আগের আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা অপরিসীম নয়। এর ক্ষমতাও নিরঙ্কুশ নয়। সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও নির্বাচন কমিশনের গঠন, কার্যপরিধি, ক্ষমতা ও স্বাধীনতা আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়। আইন দ্বারা এর দায়বদ্ধতাও নির্ধারিত হওয়া আবশ্যক, যাতে কমিশন ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের অধিকার পদদলিত করতে না পারে, যেমনিভাবে গত তিনটি নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে। তা সম্ভব হয়েছে, কারণ নির্বাচন কমিশনের জন্য আমাদের দেশে একটি যথোপযুক্ত আইন ছিল না ছিল না একটি নজরদারিত্বের কাঠামো। বহু গড়িমসির পর ২০২২ সালে যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, তা ছিল মূলত নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন, যা দিয়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা সম্ভব ছিল, যারা জনস্বার্থের পরিবর্তে তাদের নিয়োগকর্তাদের স্বার্থে কাজ করেছিল এবং আমাদের নির্বাচনব্যবস্থাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বহু নাগরিককে প্রাণ দিতে এবং অনেককে গুরুতরভাবে আহত হতে হয়েছে। তাই আমরা নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দায়বদ্ধতার কাঠামো সৃষ্টির সুপারিশ করেছি।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশন দেশের আমলাতন্ত্র তথা নির্বাহী বিভাগের কাছে অনেকটাই জিম্মি উল্লেখ করে বলা হয়- যেমন, কমিশনের নির্বাচনী আইনকানুন সংস্কারের প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে যায়, যার চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর। তেমনিভাবে কমিশনের আর্থিক বরাদ্দের প্রস্তাব যায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে, যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নির্ভর করে আমলাতন্ত্রের ওপর। আমলাতন্ত্র ও নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্বাচন কমিশনের এমন নির্ভরশীলতা দূর করতে আমরা নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার কমিশনের পক্ষে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন-সংক্রান্ত সব ব্যয় প্রজাতন্ত্রের সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব  করেছি। প্রসঙ্গত, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনারদের পারিশ্রমিক ও সচিবালয়-সংক্রান্ত ব্যয় প্রজাতন্ত্রের সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত।

একই সঙ্গে আমরা নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বের আওতা থেকে মুক্ত করে সংসদের উচ্চকক্ষের একটি সর্বদলীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে সব যোগাযোগের মাধ্যমে পরিণত করার গুরুত্বও অনুধাবন করছি। এ কমিটি নির্বাচন কমিশনের আইন-সংক্রান্ত, আর্থিক ও অন্যান্য প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। এ যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিশেষ কমিটির আলাপ-আলোচনা এবং কমিশনের পক্ষ থেকে তাদের প্রস্তাবের যৌক্তিকতা তুলে ধরার সুযোগ হবে, যা বিদ্যমান ব্যবস্থায় ঘটে না। বিশেষ কমিটির দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের কাজের তদারকি করা বা কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া নয়, বরং কমিশনের কাজে সহায়কের ভূমিকা পালন করা, যাতে কমিশন নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে পারে।

বিশেষ সংসদীয় কমিটির আরেকটি দায়িত্ব হবে নির্বাচন কমিশনকে, মেয়াদ শেষে, তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও শপথ ভঙ্গের জন্য দায়বদ্ধ করা। মেয়াদকালে অসদাচরণের দায়ে নির্বাচন কমিশনকে, সংবিধানের ১১৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে, যদিও গত সরকারের আমলে এটি কার্যকর ছিল না। কিন্তু মেয়াদ অবসানের পর নির্বাচন কমিশনকে দায়বদ্ধ করার কোনো পদ্ধতি বর্তমানে বাংলাদেশে নেই, যদিও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউই দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়।