ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে বারবার শোনা গেছে ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ শব্দবন্ধ। অর্থাৎ কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি সরকার। বহু বছর পর তার সেই স্বপ্ন পূরণ হলো রাজধানীতে। দিল্লি বিধানসভায় নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেল পদ্ম শিবির। ২৭ বছর পর বিধানসভা জিতে সারা দেশে না হলেও দিল্লিতে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ চলতে শুরু করে দিল বিজেপি।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দিল্লি বিধানসভার ৭০টি আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়। দুই দফায় ক্ষমতায় থাকা আপ ও বিজেপির মধ্যে সরাসরি লড়াই ছিল। তৃতীয় শক্তি হিসেবে ছিল কংগ্রেস। এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে বিপুল জয় পেয়েছে বিজেপি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, বিজেপি ৪৮ আসনে জয় পেয়েছে। আর আম আদমি পার্টি জিতেছে ২২ আসনে। যদিও প্রাপ্ত ভোটে বেশি ফারাক নেই। বিজেপি ৪৬ ও আপ ৪৪ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়েছে। কংগ্রেস কোনো আসন জিততে না পারলেও ৭ শতাংশের মতো ভোট গেছে তাদের ঝুলিতে। আর এ সমীকরণই আগের দুই নির্বাচনে ৬০টির বেশি আসন পাওয়া আপকে ধরাশায়ী করেছে।
গত বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র আটটি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। তার আগের বার ফল ছিল আরও শোচনীয়, মাত্র তিনটি আসন জিতেছিল তারা। সেখান থেকে এ বার পঞ্চাশের আশপাশে পৌঁছে গেছে গেরুয়া ব্রিগেড।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কে হবেন দিল্লির নতুন মুখ্যমন্ত্রী? সেটা নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত হবে বলে বিজেপি সূত্রের খবর। তবে অনেকে বলছেন, রাজস্থান বা মধ্যপ্রদেশের মতো চমক জাগিয়ে কোনো নতুন মুখকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয় কি না, সেদিকে নজর রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কেজরিওয়ালকে হারানো সাবেক বিজেপি সাংসদ প্রবেশ বর্মা এগিয়ে রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারের যে আন্দোলন, তার অন্যতম সৈনিক হিসেবে উঠে এসেছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কিন্তু গত দুই বছরে তিনি সবচেয়ে বেশি বিদ্ধ হয়েছেন এই দুর্নীতির প্রশ্নেই। আবগারি কেলেঙ্কারি মামলায় জেলে যেতে হয়েছে তাকে। তার ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতার একই হাল হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর আবাস নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতির টাকাতেই কি বিলাসবহুল বাসভবন গড়ে তুলেছেন আম আদমির নেতা? বিজেপি দুর্নীতিকে সামনে রেখে জোরালো প্রচার চালিয়েছিল। ফল প্রকাশের পর আন্না হাজারে বলেছেন, ভোটের প্রার্থীকে কলঙ্কমুক্ত শুদ্ধ হতে হয়, তবেই তার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা জন্মায়। এ কথা বারবার বলেও বোঝানো যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছে, জনমোহিনী রাজনীতিতে মানুষের মন কেড়েছিলেন অরবিন্দ। এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে তার থেকেও বেশি সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। বিনামূল্যে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ শুধু নয়, যুবকদের চাকরি থেকে নারীদের অ্যাকাউন্টে টাকা, সন্তানসম্ভবাকে অনুদানের মতো নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা। খেটে-খাওয়া দরিদ্র মানুষ, যারা মূলত আপের ভোটার, তাদের জন্য প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। প্রতিষ্ঠান বিরোধী মানসিকতার সঙ্গে জনকল্যাণের রসায়ন সাফল্যের সঙ্গে বাস্তবায়িত করতে পেরেছে মোদি ব্রিগেড।
এবারের ভোটে দিল্লির দূষণও যথেষ্ট আলোচনায় ছিল। এ ক্ষেত্রে আপ ব্যর্থ বলে প্রচার করেছে বিজেপি ও কংগ্রেস। দিল্লির ব্যাপক দূষণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, যমুনার বেহাল দশা ভোটারদের একাংশকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ভোটের ঠিক আগে জাতীয় বাজেট বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। দিল্লিতে ৬৭ শতাংশ মধ্যবিত্তের বাস। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও সেনাকর্মী মিলিয়ে জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। এবারের বাজেট এই অংশকে অনেকটাই খুশি করেছে। বিশেষত ১২ লাখ রুপি পর্যন্ত বার্ষিক আয় করমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত মাস্টারস্ট্রোক বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক কৌশলেও আপ ও কংগ্রেসকে পেছনে ফেলেছে বিজেপি। নির্বাচনী ফলের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইন্ডিয়া জোট ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে না পারায় সুবিধা পেয়েছে পদ্ম শিবির। কংগ্রেস গত দুবারের বিধানসভা ভোটে সেভাবে লড়াইয়ে ছিল না। এবার তারা ভোটের ময়দানে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে আম আদমি পার্টির ভোটে ভাগ বসিয়েছে।
বিজেপিবিরোধী ভোট ভাগ হওয়ার প্রভাব দেখা গেছে এমন আসনেও, যেখানে সংখ্যালঘুরা বিপুল সংখ্যায় রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দিল্লির নির্বাচন ইন্ডিয়া জোটের অস্তিত্বকে আরও একবার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল। জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লা এক্স হ্যান্ডেলে এ কারণে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছেন, প্রাণ ভরে লড়াই করো একে অপরকে হারিয়ে দাও।
অবশ্য হারের পর কেজরিওয়াল বলেছেন, আমরা এখানে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব। সমাজসেবা এবং মানুষের হিতার্থে কাজ চালিয়ে যাব। ক্ষমতা ভোগ করার জন্য আমরা রাজনীতিতে আসিনি।
কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তারা পরিবর্তন চাইছিলেন। যারা জিতেছেন তাদের অভিনন্দন। আমরা যারা পরাজিত হয়েছি তাদের আরও পরিশ্রম করতে হবে।