‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই বাস্তবায়ন’

ব্যারাকে অতিরিক্ত কাজের চাপে থাকা পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপ হ্রাসে বছরে অন্তত একবার ভাতাসহ নির্দিষ্ট মেয়াদের ছুটিভোগ বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ সংস্কার কমিশন। পাশাপাশি পুলিশের কনস্টেবল এবং সমমানের পুলিশ সদস্যদের কাজের ব্যাপকতা, পরিধি ও সময়কাল বিবেচনায় তাদের জন্য একটি পৃথক ছুটি গ্রহণ ও ভোগের নীতিমালা তৈরির জন্য সরকারের বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ   দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ সদস্যদের জন্য শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, ছুটি, পেনশন সরলীকরণ, ঝুঁকি ভাতা/আর্থিক প্রণোদনাসহ এবং জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিচারের সুপারিশ করেছে পুলিশ সংস্কার কমিশন। অন্তর্র্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এগুলোসহ নানা সুপারিশ করেছে পুলিশ সংস্কার কমিশন।

এসব সুপারিশের ভিত্তিতে মন্তব্য চাওয়া হয় মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলোজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুকের কাছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংস্কারের অনেকগুলো ভালো বিষয় আছে। পুলিশ কমিশন করে যদি এগুলো প্রয়োগ করা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে এগুলো মানুষের বিচারিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে যে সুরক্ষা এবং মানুষের ন্যায্যতা পাওয়ার যে জায়গা, সেটা নিশ্চিত হতে পারে। তবে এখানে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। সেগুলো হলো, ইনভেস্টিগেশনটা (তদন্তকাজ) যদি সম্পূর্ণ আলাদা করা যেত তাহলে ভালো হতো। পুলিশের একটা উইংই থাকবে যারা শুধু ইনভেস্টিগেশন করবে। পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বাংলাদেশ) যেমন করে। কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, ইনভেস্টিগেশনটা যেমন সরকারিভাবে করে তেমনি বেসরকারিভাবেও কিছু সংস্থাকে সেটা দেওয়া যেতে পারে। কারণ ইনভেস্টিগেশন যেন বায়াসড (পক্ষপাত) না হয় এবং ক্রস যেন করা যায়। সেই সঙ্গে যেন ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ) হয়। এটা উন্নত দেশগুলোতে আছে।

অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন সরকারিভাবে পুলিশ যেমন কোনো ক্রাইমের ক্ষেত্রে তদন্ত করে। পাশাপাশি বেসরকারি কিছু লিগ্যাল রাইটস অর্গানাইজেশন আছে যেটা সরকারি অনুমোদিত। তারাও কিন্তু ইনভেস্টিগেশন করে। এভাবে দুটো ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট যখন কোর্টে উপস্থাপন করা হবে তখন কিন্তু জাস্টিফাই (বিচার) করতে অনেক সুবিধা হবে। যেখানে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ থাকবে না। এভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত আমরা আশা করতে পারি। যদি প্যারালালই আরেকটা সংস্থা না থাকে তাহলে সেটা (তদন্ত) সেভাবে সম্ভব হবে না। এই জায়গাটা অ্যাড্রেস করা হয়নি।

ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের মধ্যে থেকে ইন্টারোগেট (জিজ্ঞাসাবাদ) করার ক্ষেত্রে পুলিশের যথেষ্ট পরিমাণ দক্ষতা থাকতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক ওমর ফারুক। তিনি বলে অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারে যদি পুলিশ দক্ষ না হয় তাহলে নির্যাতন ছাড়া অথবা মানসিক অত্যাচার ও নির্যাতন ছাড়া বাংলাদেশের পুলিশ এটা (তদন্ত) পারবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত একটা সংস্থাকে তারা অন্তর্ভুক্ত করবে। অপরাধীদের মনস্তত্ত্বিক বোঝার জন্য তাদের বিশেষ দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন আছে। যেগুলো এই সংস্থা তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখাবে। এটা করতে পারলে অপরাধীদের কাছ থেকে সহজেই তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এগুলো উন্নত দেশে করা হয়। এই দুটো জায়গায় আমার পর্যবেক্ষণ আছে। নির্যাতন ছাড়া হয়তো জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্ত হতে পারে কিন্তু সেটার জন্য কৌশল এবং শিক্ষা দরকার সেগুলো বাংলাদেশের পুলিশের এই মুহূর্তে নাই। এগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এখন না হলেও ভবিষ্যতে এটা করতে হবে। আর রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে যদি পুলিশ আবার আগের মতো হয় যায়। তাহলে এইখানে একটা চ্যালেন্স আমাদের থেকে গেছে। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি যদি শক্তিশালী থাকে, ন্যায় বিচার এবং ন্যায্যতা এবং সংবিধানের প্রতি তাহলে যে সুপারিশগুলো করেছে সেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হলে মানুষসেবা পাবে। সেবার মান বৃদ্ধি পাবে এবং প্রত্যাশীত সেবা পাবে বলে আমি মনে করি।’