রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস শাবান। রজব পবিত্র চার মাসের একটি। রমজান মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। তবে শাবান মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে অনেকেই হয়তো অবগত নয়। এ মাসের গুরুত্ব অনেক। আর এ গুরুত্বের কারণেই রাসুল (সা.) শাবান মাসকে তার নিজের মাস বলেছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘রজব হলো আল্লাহর মাস। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর মাস রজবকে সম্মান করল, সে আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল। আর যে আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতুন নাইমে প্রবেশ করাবেন। আর শাবান হলো আমার মাস। যে ব্যক্তি শাবান মাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল সে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করল। যে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, কেয়ামতের দিন আমি হব তার অগ্রবর্তী এবং সওয়াবের ভাণ্ডার। আর রমজান মাস হলো আমার উম্মতের মাস।’ (শুআবুল ইমান ৩৫৩২)
রাসুল (সা.) শাবান মাসে অধিক রোজা রাখতেন এবং তার সাহাবিদেরও রোজা রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) একাধারে এত অধিক রোজা পালন করতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর রোজা পরিত্যাগ করবেন না। আবার কখনো একাধারে এত বেশি রোজা পালন না করে কাটাতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর নফল রোজা পালন করবেন না। আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে রমজান ছাড়া অন্য পুরো মাসের রোজা পালন করতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে কোনো মাসে অধিক নফল রোজা পালন করতে দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি ১৯৬৯) অপর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শাবান মাসে আমলনামাগুলো আল্লাহর কাছে উত্তোলন করা হয়। আর আমি পছন্দ করি যে আমার আমলনামা আল্লাহর কাছে উত্তোলন করা হবে রোজা পালন করা অবস্থায়।’ (সুনানে নাসায়ি ২৩৫৭)
রাসুল (সা.) এ কারণেই এ মাসে অধিক রোজা পালন করতেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, আল্লাহর দরবারে প্রতিদিন আমলনামা পেশ করা হয়, দিনের আমলনামা রাতে আর রাতের আমলনামা দিনে। (সহিহ হাদিস ১৭৯) এটা হলো প্রতিদিনের আমলনামা। অপর এক হাদিসে আছে, সপ্তাহে দুই দিন আমলনামা পেশ করা হয়, সোমবার ও বৃহস্পতিবার। (সহিহ মুসলিম ২৫৬৫) এটা হলো সাপ্তাহিক আলমনামা। আর বাৎসরিক আমলনামা পেশ করা হয় শাবান মাসে।
শাবান মাসের অন্যতম ফজিলত হলো এ মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি। হাদিসে এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ তথা শাবান মাসের মধ্য রজনী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর আমাদের কাছে এটি শবেবরাতের রাত নামে পরিচিত। হজরত আবু মুসা আশয়ারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে তার সমস্ত মাখলুকের প্রতি মনোযোগ আরোপ করেন। মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তিদের ছাড়া সবাইকে মাফ করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ ১৩৯০)
শবেবরাত সম্পর্কে অনেক কুসংস্কার আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। যেমন খিচুড়ি বা হালুয়া-রুটি রান্না করে নিজেরা খাওয়া, গরিব মিসকিনদের খাওয়ানো, ঘর বাড়ি, মসজিদ, দোকানপাট আলোকসজ্জা করা, মাজারে শিরনি দেওয়া ইত্যাদি। হাদিসে এ বিষয়ে কোনো বর্ণনা নেই। সুতরাং শবেবরাতের উদ্দেশে এ কাজগুলো করা বিদআতের পর্যায়ে চলে যায়। শবেবরাতে এ কাজগুলো না করে মূল কাজ নামাজ, রোজা, তওবা, ইসতিগফার ইত্যাদি নফল ইবাদতে মশগুল থাকা কাম্য।
মহান আল্লাহ শাবান মাসে আমাদের বেশি বেশি করে নফল ইবাদত করার তওফিক দান করুন এবং আমাদের দেশে প্রচলিত শবেবরাত-কেন্দ্রিক কুসংস্কার থেকে দূরে রাখুন। আমিন।