জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে দেশ জুড়ে একযোগে চলছে বিশেষ অভিযান। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’। গত শনিবার শুরু হওয়া এই অভিযানে পুলিশকে সার্বিকভাবে সহায়তা করছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। অভিযান পরিচালনায় নেওয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ প্রযুক্তিগত সহায়তা। তবে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, যেই ‘ডেভিলদের’ বিরুদ্ধে এই অভিযান, তারা কারা? গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে একই ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছিল পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমকে। উত্তরে তিনি বলেন, ‘সমাজবিরোধী ও অস্থিরতা সৃষ্টিকারীরাই ডেভিল। মূলত সমাজের স্থিতিশীলতা যারা নষ্ট করবে, তারাই ডেভিল হিসেবে চিহ্নিত হবে।’
ধরা পড়ছে কারা : গাজীপুরে ছাত্রদের ওপর গত শুক্রবার রাতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। গাজীপুরে গত শুক্রবার রাতে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার পরদিন শনিবার রাত ১২টা থেকে শুরু হয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্ট। মোজাম্মেল হকের বাড়িতে মারধরের শিকার হন ১৫-১৬ শিক্ষার্থী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলছেন, শিক্ষার্থীরা ওই রাতে ডাকাতির খবর পেয়ে তা প্রতিহত করতে সেখানে গিয়েছিলেন। তখন তাদের মারধর করা হয়।
শনিবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রকাশ করা হিসাব অনুযায়ী অপারেশন ডেভিল হান্টে গ্রেপ্তার হয়েছে ২ হাজার ২৫৮ জন। এর মধ্যে শনিবার রাত থেকে রবিবার বিকেল পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৩০৮ জন, রবিবার বিকেল থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৪৩ জন এবং সর্বশেষ গতকাল বিকেল পর্যন্ত গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল ৬০৭ জন। এর মধ্যে শেষের দুদিন একই সময়ে অন্যান্য মামলা ও পরোয়ানার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়েছে আরও ২ হাজার ৩৪৬ জন। তিন দিনে গ্রেপ্তারদের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ তালিকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী দল-গোষ্ঠীর মানুষের পাশাপাশি রয়েছে ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, কিশোরগ্যাং সদস্যসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি গ্রেপ্তার হচ্ছেন দলটির সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রীরাও। অপারেশন ডেভিল হান্টে কাদের ধরা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, ‘আগেও অপরাধী ধরা হয়েছে। এখনো ধরা হচ্ছে। তবে এই আভিযানিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে সারা দেশে বেশিমাত্রায় অপরাধী ধরা পড়ছে।’
কতদিন পর্যন্ত চলবে অপারেশন ডেভিল হান্ট : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন ডেভিল হান্টের প্রাথমিক ধাপে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে। ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্রসহ রড ও লাঠি উদ্ধার হয়েছে ৫৬টি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এ অভিযান দীর্ঘমেয়াদি হবে এবং সন্ত্রাসবাদের মূল উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে ধারণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে এক কর্মশালায় বক্তব্যের সময় তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে যেন কোনো ডেভিল (অপরাধী) পালাতে না পারে। পুলিশ, র্যাব, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আইনি প্রক্রিয়ায় এই অপরাধীদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যককে গ্রেপ্তার করেছে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। সারা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপতৎপরতাকারী ও তাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশের অভিযান সংশ্লিষ্ট সামগ্রিক কার্যক্রম তদারকি করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশ সদর দপ্তরে স্থাপিত জয়েন্ট অপারেশন সেন্টারের মাধ্যমে অপারেশন ডেভিল হান্টের সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয় করা হবে।’
হাতিয়ায় যৌথ বাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল হামলা : নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় অভিযানে থাকা যৌথ বাহিনীর সদস্যদের গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ২৪ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে দুজনকে বিপুল অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছেন। গত সোমবার রাত ১১টার দিকে উপজেলার চরকিং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউসার মিয়ার ইটভাটার সামনে এ ঘটনা ঘটে।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন নবীর উদ্দিন (৫০) ও ইমাম হোসেন (৫০)। তাদের কাছ থেকে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, ছয়টি ধারালো অস্ত্র, আটটি গুলি ও ২০টি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় গ্রেপ্তার ৯ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী : চুয়াডাঙ্গায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ৯ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের জেলার পাঁচটি থানায় হওয়া বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ফরিদপুরে ইউপি চেয়ারম্যানসহ ১০ আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার : ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে গতকাল সকাল পর্যন্ত দুই জনপ্রতিনিধিসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য এবং আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছেন।
সিএমপির নিয়মিত অভিযানে গ্রেপ্তার ৩০ : চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ৩০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জে গ্রেপ্তার ২০ : নারায়ণগঞ্জে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সোমবার রাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাদের আটক করে।
টাঙ্গাইলে আ.লীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার : টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন ভূঞাপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন এবং একই ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম।
রংপুরে গ্রেপ্তার ২১ : রংপুর নগরীসহ এ বিভাগ থেকে ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনী। এর মধ্যে নগরীতে তিনজন এবং রংপুর বিভাগের আট জেলা থেকে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গাজীপুরে আটক ৮১ : অপারেশন ডেভিল হান্টের তৃতীয় দিনে গাজীপুর জেলায় ৮১ জন আটক হয়েছে। তার মধ্যে মহানগরীর ৮ থানায় ৬৯ এবং জেলার পাঁচ থানা এলাকা থেকে ১২ জনকে আটক করা হয়।
বাগেরহাটে আ.লীগের ২১ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার : বাগেরহাটে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় অপারেশন ডেভিল হান্টে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ১৯ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনী।
পটুয়াখালীতে যুবলীগ নেতা আটক : পটুয়াখালীর মহিপুরে মামুন হাওলাদার (৪৫) নামের এক যুবলীগ নেতাকে আটক করা হয়েছে। সোমবার রাত ৩টার দিকে মহিপুর সদর ইউনিয়নের কাঠপট্টি এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়।
মোংলায় আগ্নেয়াস্ত্রসহ চারজন আটক : কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন অধীনে বিসিজি বেইস মোংলা, নৌবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে বাগেরহাটের মোংলা থানার চাঁদপাই ইউনিয়নের মালগাজী এলাকা এবং বুড়িডাঙ্গা ইউনিয়নের দিগরাজ বাজারসংলগ্ন এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগের চার নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি বন্দুক ও ১৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
চট্টগ্রাম ব্যুরো এবং সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি