দুয়ারে করা নাড়ছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এসব দিবসে ফুলের ব্যাপক চাহিদা এবং ভালো দাম থাকায় সাভারের গোলাপ গ্রামের ফুল চাষিদের দম ফেলার ফুসরত নেই। গতবার ফুল বাগানে রোগবালাই হলেও এবার ফুলের বাম্পার ফলন হওয়ায় অধিক মুনাফার আসায় বাগান পরিচর্যার পাশাপাশি প্রতিদিন ফুল তুলায় ব্যস্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাগানে পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার, নতুন চারা উৎপাদনের পাশাপাশি নিয়মিত ফুল কেটে বাজারে বিক্রি করছেন তারা।
এখন বাজারে প্রতিটি গোলাপ ১০-১৫ টাকায় বিক্রি হলেও সামনে পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসে ফুলের বিশেষ চাহিদা থাকায় ভালো দাম পাওয়া যাবে। যা থেকে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে লাভের আশায় স্বস্তি ফিরেছে গোলাপ গ্রামের ফুল চাষিদের ঘরে। তাদের সফলতার গল্পে দিন দিন নতুন করে গোলাপ চাষের দিকে ঝুঁকছেন অনেকেই।
সাভারে বিরুলিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত গোলাপ গ্রামে প্রতিদিন ফুল কাঁটা, আগাছা ছাটা ও নতুন চারা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ফুলচাষিরা। এখানকার গোলাপের সারাবছর চাহিদা থাকলেও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও ২১শে ফেব্রুয়ারির তিন দিবসকে ঘিরে কৃষকদের ফুল বিক্রি বেড়ে যায়। এসময় প্রচুর চাহিদার কারণে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায় এবং বিক্রিও হয় কয়েকগুণ। এবার গোলাপ বাগানে কোনো রোগবালাই আক্রমণ না করায় প্রতিটি বাগানেই ফুলের বাম্পার ফলন হয়েছে। এ মাসেই পাশাপাশি ৩টি দিবস থাকায় ভালো বিক্রির আশা করছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে বিরুলিয়া ইউনিয়নের কুমারখোদা, বাগ্নিবাড়ি, মৈস্তাপাড়া, শ্যামপুর ও সাদুল্ল্যাহপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিগন্তজোড়া ফুলের বাগানে শোভা পাচ্ছে বাহারি রংয়ের ফুটন্ত গোলাপ। প্রতিটি বাগানেই ফুল তুলার পাশাপাশি আগাছা পরিষ্কার ও নতুন ফুলের চারা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গোলাপ চাষিরা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ফলন ভালো হওয়ায় বাড়তি লাভের আশায় বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত ফুলচাষীরা। প্রতি বছরের মতো এবারও বাড়তি লাভের আশায় দিন গুনছেন তারা।
প্রায় ২০ বছর ধরে ফুলচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ফুলচাষি আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, এবার ফুলের দাম এবং ফলন ভালো হওয়ার কারণে আমাদের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। গতবার তো রোগব্যাধি লেগেছিল, এবার সেটা হয়নি। বাজার ভালো হচ্ছে এবং বাগানেও প্রচুর ফুল আছে। গোলাপচাষিরা বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে লাভের আশা দেখেন। এবারও তিনি গোলাপ চাষ করে লাভবান হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
গোলাপ চাষিরা জানান, বিরুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় তিন’শ হেক্টরের মত জমিতে গোলাপসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষ হয়ে থাকে। বাজারে প্রতি পিস ফুল বর্তমানে ১০-১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাল গোলাপ, সাদা গোলাপসহ বিভিন্ন ফুল চাষ হয়েছে এবার। প্রতিদিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ফুল চাষিরা কাঁটা ভর্তি গাছ থেকে ফুল তুলে স্থানীয় শ্যামপুর বাজারে নিয়ে যান। সেখান থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা ফুল কিনে নিয়ে যান।
রাজধানীর আগারগাঁও থেকে সাভারে ফুল কিনতে আসা সোলায়মান হোসেন বলেন, আগারগাঁও থেকে প্রতি সপ্তাহেই এখানে ফুল নিতে আসি। কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার ফুলের মান অন্যান্য জায়গার থেকে ভালো এবং দামেও সস্তা। এছাড়া পরিবহন খরচ কম এবং সহজ হওয়ায় দ্রুত ফুল নিয়ে বিক্রি করে অনেক লাভ করা সম্ভব।
মিরপুর থেকে গোলাপ গ্রামে বেড়াতে আসা মনির হোসেন বলেন, মিরপুর থেকে সহজেই ট্রলারে করে বিরুলিয়ায় আসা যাওয়া করা যায়। তাই পরিবার নিয়ে বছরের বিভিন্ন সময়ে সুযোগ হলেই এখানে বেড়াতে আসি। এখন যেহেতু শীতের আবহাওয়ায় সূর্যের তাপ কম থাকে পরিবার নিয়ে গোলাপ বাগানের মেঠো পথে হেটে বেড়াতেও ভালো লাগে।
কুমারখোদা এলাকার ফুলচাষি জশিম বলেন, দুই বিঘা জমিতে করা বাগান থেকে প্রতিদিন এক হাজার গোলাপ তুলতে পারি। ফলনের পাশাপাশি বাজারদর বেশ ভালোই আছে। সামনে পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারি আছে। আশাকরি ২-৩ লাখ টাকার ফুল আমি বিক্রি করতে পারবো।
আড়াই লাখ টাকা খরচ করে সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে ফুল চাষ করা শামীম বলেন, কোন রোগবালাই না হওয়ায় ভালো ফলন হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছি। সামনে তিনটি দিবসে যদি আবহাওয়া ভালো থাকে আরও দুই লক্ষাধিক টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবো। তবে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কোন সহায়তা বা পরামর্শ দেয়া হয়না জানিয়ে ফুল চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সাভার উপজেলা কৃষি অফিসার আল মামুন জানান, গোলাপের অত্যধিক চাষ হওয়ায় পুরো ইউনিয়নটি গোলাপ গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এখানে ৩০৫ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়ে থাকে যার মধ্যে শুধুমাত্র গোলাপ চাষ হয় ২৩০ হেক্টর জমিতে। বাকি জমিতে বিদেশী ফুল জারবেরা, মাম, জিপসি, গ্লাডিওলাসহসহ অন্যান্য ফুল চাষ হয়। প্রতিবছরে ৪৫-৫০ থেকে কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয় তার মধ্যে ৩৫-৩৭ কোটি টাকার শুধু গোলাপ বিক্রি হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় এবং রোগবালাই কম হওয়ার কারণে সাভার উপজেলার এবার ফুলের বাম্পার ফলন হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক নজরদারিতে এবং উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে সময়মতো কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করার কারণে উৎপাদন ভালো হয়েছে। সাভার উপজেলায় প্রায় ২ হাজার কৃষক পরিবার ফুল চাষের সাথে সম্পৃক্ত। সামনেই ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন ও ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে এই অর্থবছরেও ৪৫-৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে বলে আমরা আশাবাদী।
দিবসগুলোকে ঘিরে কৃষকেরাও তাদের ফুলের কাঙ্ক্ষিত ভালো দাম পাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে। পাশাপাশি ফুল চাষের প্রতি যাতে কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হয় এজন্য কৃষকদেরকে নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে উৎসাহিত করে যাচ্ছি।