বইমেলা উপলক্ষে পাঠকের প্রস্তুতি

শুরু হয়েছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৫। বইপ্রেমী মানুষ সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন এই মেলার জন্য। কিন্তু ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অধিকাংশ মানুষই ইচ্ছামতো মেলায় যেতে পারেন না। অল্পসময়ে নিজের পছন্দমতো বই কিনতে এবং মেলা উপভোগ করার জন্য তাই প্রয়োজন হয় একটি গোছানো পরিকল্পনার। বইমেলার জন্য পাঠকের প্রস্তুতি নিয়ে লিখেছেন অহিদুল ইসলাম অন্তর

বইপ্রেমীদের প্রাণের মেলা বইমেলা, দাপ্তরিক নাম ‘অমর একুশে বইমেলা’। ভাষার মাসে রাজধানী ঢাকার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এবারের বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ’। এবারের মেলায় অংশ নিচ্ছে ৭০৮টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৩৫।

বইমেলা শুধুই বই কেনার স্থান নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনও বটে। মাস জুড়ে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের পদচারণায় মুখরিত থাকে মেলা প্রাঙ্গণ। বইমেলা একদিকে যেমন নতুন বই প্রকাশের কেন্দ্র, তেমনি পাঠক ও লেখকের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন এবং মেলবন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যা বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বইমেলার সময়সূচি

১ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে। তবে রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। আর ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে বইমেলা।

একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে মেলা শুরু হবে সকাল ৮টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। এ ছাড়াও অমর একুশে বইমেলার ওয়েবসাইট ভিজিট করে অন্যান্য তথ্য পেয়ে যাবেন।

বইমেলায় যাওয়ার আগে

বইমেলায় যাওয়ার আগে নিজের সময় ও সুযোগ বুঝে একটি সুন্দর পরিকল্পনা করে নেওয়া উচিত। যেখানে থাকবে মেলায় যাওয়ার সময়সূচি, পছন্দের লেখক ও বইয়ের তালিকা এবং বাজেটের সঙ্গে সমন্বয়। একটি সুন্দর পরিকল্পনা যেমন মেলায় যাওয়ার আনন্দ বাড়িয়ে দেবে, তেমনি বাঁচিয়ে দেবে সময় ও অর্থ, কমাবে অহেতুক ভোগান্তি।

বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করা : বইমেলা এক বিশাল আয়োজন। এত এত স্টল আর মানুষের সমাগমের মাঝে পছন্দের বই খুঁজে বের করা একটু কঠিন। সময় বাঁচাতে ও ভোগান্তি কমাতে বইমেলাতে যাওয়ার আগেই, যে বইগুলো কিনতে চান তার একটি তালিকা তৈরি করে নিন। তালিকায় রাখতে পারেন পছন্দের প্রকাশনী কিংবা লেখকদের নতুন প্রকাশিত বই। খোঁজ রাখতে পারেন মেলায় এবারই বই প্রকাশিত হলো এমন তরুণ লেখকদের বইয়েরও।

নিজ ক্যাম্পাস কিংবা আশপাশের পরিচিতিদের মাঝে খোঁজ নিলে দেখবেন, অনেকেই এবার প্রথম বই প্রকাশ করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখি করা যাদের এক ধরনের নেশা, ভালোলাগা-ভালোবাসা তাদের উৎসাহ দিতে, অনুপ্রেরণা জোগাতে পছন্দের বইয়ের তালিকায় যোগ করতে পারেন এমন তরুণ লেখকদের বইও।

নতুন বইয়ের তালিকা করতে অনলাইনে ঢুঁ মারতে পারেন অমর একুশে বইমেলা নামে বাংলা একাডেমির ওয়েবসাইটে। এ ছাড়াও প্রকাশনীর নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট, রকমারি কিংবা বাতিঘরের ওয়েবসাইট ঘুরে আসুন। দেখে নিন নতুন কী কী বই বের হয়েছে। বইয়ের তালিকা করার সময় অবশ্যই বইয়ের নাম, লেখকের নাম, মূল্য ও প্রকাশনীর নামের সঙ্গে স্টল কিংবা প্যাভিলিয়ন নম্বর টুকে নিতে হবে। এতে করে খুব সহজেই পছন্দের তালিকা অনুযায়ী বই খুঁজে নিতে পারবেন।

বাজেটের সঙ্গে সমন্বয় : শুধু পছন্দের বইয়ের তালিকা করলেই চলবে না। একই সঙ্গে বাজেটের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তাহলে বইমেলায় গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে বেশি বই কিনে ফেলা বা বাজেট সংকটে পড়ার মতো বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না।

বইমেলায় যাতায়াত ভাড়া, হাল্কা খাবারের খরচ, বন্ধুদের জন্য বরাদ্দ এবং নিজের বই কেনার জন্য আলাদা বাজেট রাখুন।

সময় নির্ধারণ : বইমেলার সম্পূর্ণ প্রাঙ্গণ ঘুরে বই দেখতে হাতে রাখতে হবে পর্যাপ্ত সময়। অতএব, মেলার সময়সূচি দেখে নিজের সময় ও সুযোগ মতো নির্দিষ্ট সূচি প্রস্তুত করুন। এক্ষেত্রে প্রথমে দেখে নিন, কদিন মেলায় আসতে পারবেন। একদিনের বেশি আসার সুযোগ থাকলে, বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণ ভাগ করে নিতে পারেন। লক্ষ রাখতে হবে, কোন প্রকাশনী কোথায় স্টল কিংবা প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ পেয়েছেন। আপনার পছন্দের প্রকাশনী কোথায় স্টল পেয়েছে তা আগে থেকেই জেনে নিয়ে

সে অনুযায়ী মেলায় ঘোরার পরিকল্পনা নিতে পারে।

শারীরিক প্রস্তুতি : সবার আগে সুস্থ থাকা জরুরি। বেশ অনেকটা সময় হাঁটাহাঁটি করতে হবে। তাই হাঁটার উপযোগী পোশাক ও জুতা পরুন। সঙ্গে পানির বোতল, খাবার স্যালাইন এবং ধুলাবালি থেকে মুক্তি পেতে মাস্ক রাখুন।

বইমেলায় যাওয়ার পর

বইমেলায় যাওয়ার পর কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। এই জিনিসগুলো খেয়াল না রাখলে এমন অনেক কিছুই আপনি মিস করবেন, যেটার জন্য হয়তো পরে আপনার আফসোস হবে। কারণ এই বিষয়গুলো অংশগ্রহণ আপনার বইমেলায় অংশগ্রহণ আনন্দদায়ক করে তুলবে।

মেলার পুরো প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা : প্রতিবারের মতো এবারও বইমেলাকে সাজানো হয়েছে নান্দনিকভাবে। তবে এবারের বইমেলার অন্যতম সৌন্দর্য হলো, জুলাই-অভ্যুত্থানের স্মৃতিবাহী প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন। স্টলগুলোতেও রয়েছে এই স্পিরিট। মেলায় ঘুরতে ঘুরতে নান্দনিকভাবে সাজানো স্টলগুলো আবিষ্কারের আনন্দই অন্যরকম। হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে মেলায় ঢোকার পর বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার স্টলগুলো ঘুরে দেখুন। নতুন লেখক ও প্রকাশক খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। অনেক সময় প্রকাশকরা নতুন বইয়ের ওপর বিশেষ ছাড় বা অফার দিয়ে থাকেন, যা আপনার বাজেটের মধ্যে পড়ে। বাজেট না থাকলে তাদের ক্যাটালগ সংগ্রহ করতে পারেন, তাহলে পরে কাক্সিক্ষত বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন।

প্রিয় লেখকদের অটোগ্রাফ ও ফটোগ্রাফ : মেলার একটি বড় আকর্ষণ হলো প্রিয় লেখকের দেখা পাওয়া। অনেকেই মেলায় বই কেনেন, কারণ স্মৃতি হিসেবে লেখকের অটোগ্রাফ নেওয়ার সুযোগ থাকে, যে সুযোগটি থাকে না বছরের অন্য সময়। এখন অটোগ্রাফের সঙ্গে ফটোগ্রাফও ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছে। লেখকের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পেলে সেটি ছাড়বেন কেন? তবে সে জন্য আপনাকে জানতে হবে কোন লেখক কবে আসছেন, কোথায় বসছেন প্রভৃতি।

দু-দন্ড বিশ্রাম : মাথার ওপরে তপ্ত সূর্য আর দীর্ঘক্ষণ হাঁটার ক্লান্তি আপনাকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। তাই মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে ভুলবেন না। আনন্দের বইমেলাতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়া কোনো কাজের কথা নয়। মেলাতে চোখে পড়বে এমন বেশ কয়েকটি বিশ্রামের জায়গা। চাইলে এক ফাঁকে কিছু খেয়েও নিতে পারেন ফুড কর্নারের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে। মন্দির প্রাঙ্গণেও রয়েছে কয়েকটি খাবারের দোকান।

আলোচনা শুনুন : মেলায় নিয়মিতভাবে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন আলোচনাসভা ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। যেমন  লেখক বলছি মঞ্চ, জুলাইয়ের গল্প নামে মঞ্চ রয়েছে। এসব জায়গায় বসতে পারেন। একদিকে যেমন ক্লান্তি দূর হবে তেমনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার খোরাক পাবেন নিজের জন্য।

ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার : সঙ্গে যদি ছোট শিশু থাকে এবং দীর্ঘক্ষণ মেলায় থাকার পরিকল্পনা থাকে তাহলে মায়েরা ব্যবহার করতে পারেন ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার। বইমেলায় শিশুদের স্তন্যপান করানোর জন্য রয়েছে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বই : প্রতিবারের বইমেলা থেকে এবারের মেলায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই। এসব বইয়ে ফুটে উঠেছে জুলাইয়ের বিভিন্ন বিভীষিকার গল্প, আন্দোলনকারীদের সাহসিকতার গল্প। কারফিউকালীন রাজধানীসহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম নির্যাতনের নানাকাহিনি। বইমেলায় এসব বই দেখতে পারেন বিভিন্ন প্রকাশনীর প্যাভিলিয়ন ও স্টলে।