ঝগড়া মানুষকে পথভ্রষ্ট করে

পৃথিবীর সব মুসলমান ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। ইসলাম ভ্রাতৃত্বের বিষয়ে ভীষণ গুরুত্ব দিয়েছে। ভ্রাতৃত্ববোধ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে গভীর করে। তাই সবার কর্তব্য, পরস্পর মিলেমিশে ও ভাই-ভাই হয়ে চলার চেষ্টা করা। ঝগড়া-বিবাদ থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা। এটাই ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে কখনো বিবাদ সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব নয়। কেননা মানুষের স্বভাবে বিবাদের উপাদান-উপকরণ রয়েছে। তাই মানুষ স্বভাবতই বিবাদপ্রিয়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি এ কোরআনে লোকদের বিভিন্নভাবে বুঝিয়েছি, কিন্তু মানুষ বড়ই বিবাদপ্রিয়।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত ৫৪)

দুই অন্তরঙ্গ বন্ধুর মধ্যেও বিবাদ সৃষ্টি হয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককেও তা স্পর্শ করে। মা আর সন্তানের নাড়ির বন্ধনও এটাকে সম্পূর্ণ এড়াতে পারে না। অন্যায়ভাবে কলহ-বিবাদ ও হিংসা-বিদ্বেষ মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ও হানাহানি চলতে থাকে বছরের পর বছর এবং বংশপরম্পরায় সংরক্ষিতও হয়। অথচ ঝগড়া-বিবাদ মানুষকে হোদায়াতের পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মানুষের ইমান ও চরিত্রকে কলুষিত করে দেয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হেদায়াতপ্রাপ্ত লোক তখনই পথভ্রষ্ট হবে, যখন তারা ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে।’ অর্থাৎ হেদায়াতপ্রাপ্ত লোকেরা ঝগড়ায় লিপ্ত হবে না, কিন্তু যারা হেদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুত হবে, পথভ্রষ্ট হবে, তারাই অহেতুক ঝগড়ায় লিপ্ত হবে।’ (ইবনে মাজাহ ৪৮)

তাই আমাদের উচিত ঝগড়া থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা। এমনকি যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত বিষয়ে ঝগড়া করার ব্যাপারেও ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। রাসুল (সা.) ঝগড়া এড়িয়ে চলা মানুষদের জন্য জান্নাতের বিশেষ উপহারের ঘোষণায় বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ন্যায়সংগত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার। আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না, আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার। আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের জিম্মাদার।’ (আবু দাউদ ৪৮০০)

ঝগড়া-বিবাদ ইসলামে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডের অন্যতম। মানুষের সঙ্গে ঝগড়া নয় বরং  ধৈর্য ও উত্তম আচরণের প্রতি উৎসাহ দিয়েছে ইসলাম। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, যদি তা করো, তবে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর ধৈর্যধারণ করো, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আনফাল, আয়াত ৪৬)

ঝগড়াটে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সেই লোক সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত, যে অতি ঝগড়াটে।’ (সহিহ বুখারি ২৪৫৭)

হাদিসে এমন ব্যক্তির জন্য কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে, যে অতিমাত্রায় ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘এমন কিছু লোক রয়েছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। তারা নিজের মনের কথার সপক্ষে আল্লাহতায়ালাকে সাক্ষী রাখে।

প্রকৃতপক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক। যখন সে ফিরে যায়, তখন সেখানে অকল্যাণ সৃষ্টি এবং শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু ধ্বংসের চেষ্টা করে। আল্লাহ অশান্তি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২০৪-২০৫)

অহেতুক ঝগড়া-বিবাদ মানুষের ব্যক্তিত্বকে ত্রুটিপূর্ণ করে তুলে।

বহু কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করে। আসল শক্তিমান সেই ব্যক্তি, যে ঝগড়া-বিবাদের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।