সরকারে থেকে দল গঠন মেনে নেওয়া হবে না : ফখরুল

সরকারে বসে সরকারের সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে দল গঠন করলে তা কখনোই মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তা না হলে জনগণের যে আস্থা আপনাদের ওপর আছে, সেই আস্থা আর থাকবে না।’

গতকাল বুধবার দুপুরে ছাত্রদলের উদ্যোগে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন ধারার ছাত্ররাজনীতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল এ কথা বলেন।

গত মাসে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারলে নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে না এমন মন্তব্য করেছিলেন মির্জা ফখরুল, বিষয়টি সামনে এনে তিনি গতকাল আরও বলেন, ‘কেন বলেছিলাম, তা এখন প্রমাণিত হচ্ছে। তখন তিনি (তথ্য উপদেষ্টা) বলেছিলেন আমি নাকি এক এগারোর দিকে নজর দিচ্ছি। আমরা এক এগারোর ভুক্তভোগী। এক এগারো যারা তৈরি করেছে তারা টিকতে পারেনি মানুষের কাছে। আবারও হুঁশিয়ার করে বলে দিতে চাই, যদি আবার কেউ সেই এক এগারোর কথা চিন্তা করেন, গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে একদলীয় শাসন ফ্যাসিস্ট সরকারের দিকে যেতে চান, তাহলে কখনোই জনগণ তা মেনে নেবে না।’

নতুন যে কোনো রাজনৈতিক দলকে বিএনপি স্বাগত জানাবে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ছাত্র সংগঠন ইতিমধ্যে করেছেন, আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। যখনই দল তৈরি করবেন, স্বাগত জানাব। তার অর্থ এই নয় যে, আপনারা সরকারে বসে সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আপনাদের দল গঠন করবেন। সেটা কখনোই মেনে নেওয়া হবে না। আমি অন্তর্বর্তী সরকার এবং সরকারপ্রধানকে বলতে চাই, আপনি অবিলম্বে এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নিন। তা না হলে জনগণের যে আস্থা আপনাদের ওপরে আছে সেই আস্থাও থাকবে না।’

দেশ একটি ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে গণতান্ত্রিক শাসনে যাওয়ার জন্য একেবারে তৈরি হয়ে আছে বলে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘গোটা দেশের মানুষ এখন সেটাই চায়, তারা যাতে অতি দ্রুত একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে ফিরে যেতে পারে। এখন পর্যন্ত সাত মাসে সেই জায়গায় যেতে পারিনি। আমরা তাদের সমর্থন দিয়েছি, তারা চেষ্টা করছেন অতি দ্রুত কিছু কাজ শেষ করে নির্বাচনের দিকে যাওয়ার। কিন্তু এরই মধ্যে কতগুলো সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মধ্যে। সেই সন্দেহটা হচ্ছে যে আদৌ নির্বাচন নিয়ে এরা আন্তরিক কি না।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কারণ আছে এই সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বলেছেন, ফ্যাসিস্টদের লোকেরা যদি কেউ মাফ চেয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে চায়, তারা অংশ নিতে পারবে।’ এ সময় ছাত্রদল আয়োজিত সভায় উপস্থিত নেতাকর্মীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। তখন বিএনপির মহাসচিব প্রশ্ন করেন, এটা কি আপনারা মেনে নেবেন? জবাব আসে, না, না, না।

তখন বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এটাই প্রমাণিত হয়েছে, তারা এখন তাদের নিজেদের স্বার্থে ফ্যাসিস্টদের জায়গা দিতে চায়। এই কথাটা স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বলেছেন। হুইচ ইজ ডেঞ্জারাস। তার মানে কি আমরা এটা মনে করব, তারা সরকারে থেকে তাদের দল গোছানোর জন্য বিভিন্ন রকম কৌশল নিচ্ছেন? সেই কৌশল নিলে আমরা তা হতে দেব না। এ দেশের মানুষ তা হতে দেবে না।’

শুধু ৩৬ দিনে ফ্যাসিস্টরা হটে যায়নি উল্লেখ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘গত ১৫ বছরের আন্দোলনে ত্যাগে রক্তে ফ্যাসিস্টদের হটতে হয়েছে। অবশ্য এই ৩৬ দিন ছিল চূড়ান্ত, যে আন্দোলন সেই আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে।’

সেখানেও তাদের ছেলেরা ভূমিকা রেখেছেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা একটা হিসাব দেখেছি, সেই হিসাবে প্রায় দুই হাজার ছেলে শহীদ হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় আট শ ছেলে আমাদের ছাত্রদলের। ঠাকুরগাঁও জেলায় যে ৯জন শহীদ হয়েছেন, তার মধ্যে সাতজনই ছাত্রদলের। ছাত্রদলের কোনো ভূমিকা ছিল না, বিএনপির কোনো ভূমিকা ছিল না, এ কথা যারা বলেন, মনে হয় তাদের সঠিকভাবে উপলব্ধি করা দরকার। তথ্যগুলো নেওয়া দরকার।’

বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ‘সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা খাত’ দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের ছেলে-মেয়েরা এমবিবিএস পাস করে বিদেশে সরাসরি ভর্তি হতে পারে না। কারণ ওরা (বিদেশ) মনে করে, এখানে যে এমবিবিএস পড়াশোনা হয় সেটা সঠিক হয় না। আমাদের ছেলে-মেয়েরা দেশে মাস্টার্স পাস করে উচ্চশিক্ষায় বিদেশে গেলে তাদের আবার ল্যাংগুয়েজসহ বিভিন্ন পরীক্ষা দিতে হয়, যা আগে ছিল না। কারণ শিক্ষার ব্যবস্থাটা আগে এমন ছিল যে, একজন শিক্ষার্থী সর্ববিষয়ে পারদর্শী হতে পারে তার ব্যবস্থা ছিল।’

সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘ছাত্রদলের ইমেজ (ভাবমূর্তি) নষ্ট করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কুয়েটে কে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাকে চিহ্নিত করার দাবি জানাই। ছাত্রদল ‘গুপ্ত’ রাজনীতির অবসান চায়। এই রাজনীতি আর চলবে না।’ বৈষম্যবিরোধী নামধারী ‘গুপ্ত’ সংগঠনের এক নেতার নির্দেশে কুয়েটে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যে একটি মহল ষড়যন্ত্র লিপ্ত রয়েছে। যারা গুপ্ত রাজনীতি করে। আমরা বার বার সভা-সমাবেশে, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই গুপ্ত রাজনীতির অবসান চেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে যতবার ছাত্রদলের মিটিং হয়েছে, সেখানে আমরা গুপ্ত রাজনীতি বন্ধের বিষয়ে ব্যক্ত করেছি। কুয়েটে একটি মিছিল থেকে আমাদের ছাত্রদলের সমর্থক ও কর্মীদের ওপরে হামলা চালায়। কুয়েটে আমাদের কোনো কমিটি নেই। সেখানে সিসি ক্যামেরা রয়েছে। ওইসব সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করছি। জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এদেশে আর মব কালচার চলবে না।’ ১৫ বছরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই সবচেয়ে বেশি লড়াই-সংগ্রাম করেছে, হতাহত হয়েছে, লক্ষ হাজার মামলায় কারাভোগ করেছে, গুম-খুনে প্রাণ দিয়েছে বলে দাবি করে ছাত্রদলের কর্মীদেরকে ‘নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন ছাত্রদল সভাপতি।

অনুষ্ঠানে ঢাকার চার মহানগরে ছাত্রদলের সদস্য ফরম বিতরণ ও সদস্য নবায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম, সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক ও সদস্য সচিব মোস্তফা জামান।