শিক্ষার্থীরা লাল কার্ড দেখাল প্রশাসন ও সংগঠনকে

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ ও কাক্সিক্ষত দাবি পূরণ না হওয়ায় তিন দিনেও শান্ত হয়নি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)। গতকাল বৃহস্পতিবার উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের পদত্যাগ এবং ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রীসহ সব ছাত্র সংগঠনকে  লাল কার্ড দেখিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

তবে উপাচার্য বলছেন, ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি। পদত্যাগ ছাড়া ছাত্রদের সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে।  শিক্ষার্থীরাও দ্রুত ক্লাসে ফিরে যাবে। বিশ^বিদ্যালয় সূত্র জানায়, গতকাল সকাল থেকেই কুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হল থেকে এসে ক্যাম্পাসে সমবেত হতে থাকেন। দুপুর ১২টার দিকে তারা দুর্বার বাংলা চত্বরে জড়ো হন। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘ছাত্ররাজনীতির ঠিকানা এই কুয়েটে হবে না’, ‘নো ছাত্রদল, নো ছাত্রশিবির, নো বৈবিছাআ, অনলি ছাত্র’; ‘রক্ত যখন ঝরছিল প্রশাসন তখন কই ছিল?, ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই’সহ নানা বিষয়ে সেøাগান দেন।

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সিয়ামসহ অন্য শিক্ষার্থীরা লাল কার্ড দেখানোর সময় অভিযোগ করে তারা বলেন, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বহিরাগতদের হামলার ঘটনায় পাঁচ দফা দাবি দেওয়া হলেও কুয়েট প্রশাসন সেটা মানেনি। সে কারণে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ছাত্রবিষয়ক পরিচালককে বর্জন করা হয়েছে। আমাদের ছাত্ররাজনীতি বন্ধের আন্দোলন ভিসিবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আমরা গত পরশু (১৮ ফেব্রুয়ারি) যখন প্রশাসনিক ভবনে যাই, তখন ভিসিবিরোধী আন্দোলন ছিল না। আমরা যখন চার ঘণ্টা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি, তখন সেটা পরিণত হয় ভিসিবিরোধী আন্দোলন। প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। এজন্য আমরা নতুন প্রশাসন চাই।

এ সময় শিক্ষার্থীরা রাজনীতিমুক্ত কুয়েট ক্যাম্পাস এবং ভিসি, প্রো-ভিসি ও ছাত্রকল্যাণবিষয়ক পরিচালকের পদত্যাগ দাবি করেন। পাশাপাশি তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে লিখিত আবেদন করার তথ্য জানান। শিক্ষার্থীরা তাদের ছয় দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া থেকেও বিরত থেকে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।

শিক্ষার্থীরা বলেন, এখন যারা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন, তাদের বহিষ্কার করতে হবে। আজ (বৃহস্পতিবার) আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লাল কার্ড দেখিয়ে বয়কট ও বর্জন করেছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

এদিকে গত মঙ্গলবার কুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৮তম সিন্ডিকেট সভায় গঠিত তদন্ত কমিটি। কমিটির সভাপতি কুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এমএমএ হাসেম বলেন, আমরা তদন্তের কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আমাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। অনেক কিছু জোগাড় করতে হবে। কিন্তু অ্যাকাডেমিক ভবন তালাবদ্ধ থাকায় আমরা সেই সুযোগটা পাচ্ছি না। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা যদি আমাদের সঠিকভাবে সহযোগিতা না করে তাহলে আমরা সময়মতো রিপোর্ট দিতে পারব না। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সবার সহযোগিতা চাই।

এ ব্যাপারে কুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাছুদ বলেন, পদত্যাগ ছাড়া ছাত্রদের সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে থানায় মামলাসহ গ্রহণযোগ্য সবকিছু করা হয়েছে। আশা করছি, ছাত্ররা সবাই দ্রুত ক্লাসে ফিরবে। তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের বিশ^বিদ্যালয়কে ঠিকভাবে পরিচালনা করছি। নিয়োগ থেকে শুরু করে যত অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে; আমরা সব ঠিক করার চেষ্টা করছি। আমরা চাচ্ছি বিশ^বিদ্যালয় একটা নিয়মের মধ্যে আসুক। বিশ^বিদ্যালয়কে ভালোভাবে পরিচালনা করার জন্য সরকার আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা যদি বিশ^বিদ্যালয়কে ভালোভাবে চালাই, তাহলে কেন পদত্যাগ করব?

কুয়েটের ঘটনা নিয়ে শিবির সভাপতির বক্তব্য : ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, কুয়েটে সেই ছাত্ররাজনীতিকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছে, যে ছাত্ররাজনীতি বুয়েটের আবরার ফাহাদকে হত্যা করেছে। গতকাল দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, কুয়েটের ঘটনাটি একেবারেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদলের। এর সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই। যারা এটিকে শিবিরের সঙ্গে মেলাতে চাচ্ছেন, তাদের হীন উদ্দেশ্য রয়েছে। বরং যারাই ‘শিবিরের ওপর দায় চাপিয়ে দাও’ রাজনীতি করেন, এটি তাদেরই অপপ্রচার।

এদিকে খানজাহান আলী থানার ওসি মো. কবির হোসেন বলেন, এখনো কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের তদন্তসহ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে গত বুধবার রাতে কুয়েটে সন্ত্রাসী কর্তৃক সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার শিকার শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে অজ্ঞাতনামা ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। মামলার বাদী হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান লিটন।