চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে সমতলের আদিবাসীদের মাতৃভাষা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নিজস্ব বর্ণমালার বই না থাকায় অনেকেই তাদের মাতৃভাষার চর্চা থেকে সরে যাচ্ছেন। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা লেখাপড়া করছে বাংলা ভাষায়। কারণ তাদের ভাষায় নেই কোনো বই। এমনকি কেউ কেউ জানেন না তাদের আদি ভাষাও। বাংলা এবং ইংরেজির আধিপত্যের মধ্যে এসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া না হলে অনেক ভাষা বিলুপ্ত হবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ঠাকুরগাঁওয়ে ওঁরাও, সাঁওতাল, মশুহর, পাহান, মাহালি, ঋষিসহ বেশ কয়েকটি নৃ-গোষ্ঠীর আড়াই হাজার পরিবারের ১২ হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস। তবে দিন দিন চর্চার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। বর্তমানে মুখে মুখে টিকে আছে ওঁরাও, সাঁওতাল, মশুহর, পাহান, মাহালি, ঋষিসহ ৬টি সম্প্রদায়ের ভাষা। অধিকাংশ সম্প্রদায়ের ভাষার নেই কোনো বই, নেই নিজস্ব ভাষার বর্ণমালাও। তাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এসব ভাষা আজ বিলীনের পথে। এই সম্প্রদায়ের মানুষজন চান তাদের মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখতে।
তবে ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও স্থানীয়ভাবে কেউ কেউ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেমন, ওঁরাও সম্প্রদায়ের ভাষা শেখাচ্ছেন সুরভী কেরকাটা নামে এক তরুণী। অবশ্য তার কাছেও নেই তাদের নিজস্ব ভাষার বর্ণমালা ও বই। ইংরেজিতে রূপান্তর করা বই থেকে শিশুদের চর্চা করাচ্ছেন তাদের নিজস্ব ভাষা।
সুরভী কেরকাটার ভাষ্য, আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা আজ বিপন্নের পথে। তাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এগুলো টিকে থাকবে না। তিনি বলেন, আমি নিজ উদ্যোগে স্থানীয় আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা শেখাচ্ছি। আমি চাই তারা নিজের মায়ের ভাষার চর্চা করুক।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ফেডারেশনের সভাপতি জীতেন তির্কী বলেন, আদিবাসীদের ভাষাগুলো আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। আমরা বিভিন্নভাবে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি। কিন্তু আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
জীতেন তির্কী বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণে সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক কমিশন গঠন করতে হবে। তা না হলে অচিরেই এই ভাষাগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা সমতলে বসবাসরত আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার পথে স্বীকার করে তা সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের উদ্যোগের কথা জানান। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, আমরা চেষ্টা করছি এই অঞ্চলে আদিবাসী মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বা সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র স্থাপন করার। এটি হলে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা করা সম্ভব হবে।