ঘড়িতে তখন রাত ১২টা। একে একে ১২ জন তরুণ একত্রিত হলেন। তাদের কারও হাতে লাইট, কারও হাতে লাঠি। আর প্রত্যেকের মুখেই একটা করে বাঁশি। দেখে মনে হতেই পারে, এরা কোনো সংঘবদ্ধ চক্র। হয়তো অসৎ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা সংঘবদ্ধ বটে, তবে নেই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য। তারা প্রতিদিন রাতে এমন সংঘবদ্ধ হন সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে, নিজের গ্রামকে সুরক্ষিত রাখতে তারা নিজেদের কাঁধে তুলে নেন নৈশপ্রহরার দায়িত্ব। আসলে তারা সবাই এলাকার তরুণ। নিজ গ্রামের সুরক্ষায় একজোট হয়ে টহল প্রদান করছেন। এতক্ষণ যে গ্রামটির বর্ণনা দিয়েছি, সেই গ্রামের নাম মছে হাজী পাড়া। এটি নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের একটি আদর্শ গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তিন মাস আগেও ছোটখাটো চুরি থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ চুরি, ছিনতাইয়ে গ্রামবাসী অতিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। গ্রামগঞ্জের প্রতিটি পাড়া-মহল্লার ন্যায় মছে হাজী পাড়াতেও প্রচুর চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটত। এর ফলে আর্থিক ক্ষতি থেকে শুরু করে, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তা ছাড়া চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির আশঙ্কায় এলাকার মানুষ মানসিক অবস্থা হয়ে পড়েছিল বিপর্যস্ত। গ্রামবাসী অনেকটাই দিশেহারা ছিল।
এই দুর্বিষহ অবস্থার সমাধান কী? মানুষের জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে গ্রামের মজলিসে উপায় বের করতে পরামর্শ সভায় বসেন এলাকায় মুরব্বিরা। সেই মজলিসেই টহলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঠিক হয়, এই প্রতিদিনের এই নৈশপ্রহরায় প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে পুরুষ সদস্য সপ্তাহে এক রাত করে অংশ নেবেন। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৈরি করা হয় তালিকা ও নির্ধারিত সময়।
সেই থেকে মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় প্রায় তিন মাস থেকে মছে হাজী পাড়ার তরুণ সমাজ স্বেচ্ছায় রাত্রীকালীন টহল প্রদান করছে। তার ফলও পাওয়া গেছে হাতেনাতে। এই গ্রামের মানুষরা এখন নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারেন। এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা কমে একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। শুধু তাই নয়, বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মছে হাজী পাড়া গ্রামটিকে মাস ছয়েক আগে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিও নির্ধারণ করা হয়েছে।
মছে হাজী পাড়ার তরুণ জিহাদ জানান, ‘আমাদের গ্রামের অনেক কিশোর যুবক মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল। যার ফলে এলাকার পরিবেশের অবনতি হচ্ছিল দিনকে দিন। এ কারণে এলাকার মুরব্বিদের পরামর্শে আমরা তরুণ-যুবকরা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি।’
মছে হাজী পাড়ার আরেক তরুণ রবিউল জানান, ‘আমাদের গ্রামে ৮৪টি পরিবার রয়েছে। প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে পুরুষ সদস্য সপ্তাহে এক রাত সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে টহলে অংশ নেয়। বর্তমানে আমাদের গ্রামে কোনো চুরি-ছিনতাইয়ের নজির নেই বললেই চলে।’
মছে হাজী পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা খালেকুজ্জামান তরুণদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের এই গ্রামের মানুষেরা অনেক আন্তরিক। পারস্পরিক অবস্থা অনেক ভালো। সবার মধ্যে বন্ধনও বেশ মজবুত। আমরা গ্রামের কল্যাণে প্রতিটি সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে নিয়ে থাকি। যার ফলে আমাদের গ্রামে এখন অনেকটাই মাদক নির্মূল হয়েছে। চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও নেই বললেই চলে। আশপাশের গ্রামগুলোতেও এর ছাপ পড়েছে। সেখানেও মাদক ও চুরিচামারি অনেকাংশে কমে গেছে।’
লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ