মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা চেম্বারের আহ্বান

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি বলছে, এসএমই খাতের উন্নয়নকল্পে ঋণপ্রাপ্তিতে বিদ্যমান নীতিমালা সহজীকরণ করতে হবে। স্বল্পসুদে অর্থায়নের লক্ষ্যে বিকল্প অর্থায়ন-ব্যবস্থার প্রবর্তন ও ডিজিটাল ফাইন্যান্সিং-ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং শিল্প খাত ও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য সহনীয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

গতকাল শনিবার ডিসিসিআই আয়োজিত বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা শীর্ষক সেমিনারে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এই অভিমত জ্ঞাপন করেন।

ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতকল্পে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের হার ডাবল ডিজিটে উন্নীত করতে হবে। আর্থিক খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা আনতে হবে। ঋণের সুদহার হ্রাস, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নীতিসহায়তার ধারাবাহিকতা, অবকাঠামো খাতে সমন্বিত উন্নয়ন, মূল্যস্ফীতি কমাতে বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভ্যাট হ্রাস এবং শিল্প খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়ক জ্বালানি মূল্য নীতিমালা প্রণয়ন একান্ত অপরিহার্য বলে মত প্রকাশ করেন তাসকীন আহমেদ।

তাসকীন আহমেদ সেমিনারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতির ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বলেন, এ সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ, এফডিআই, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত, সিএমএসএমই, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, লজিস্টিক অবকাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের হার ডাবল ডিজিটে উন্নীতকরণ, মন্দঋণ কমাতে নজরদারি বাড়ানো, আর্থিক খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা আনয়ন এবং ঋণের সুদহার হ্রাস একান্ত অপরিহার্য। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অবৈধ সিন্ডিকেট ভাঙতে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভ্যাট হ্রাসের পাশাপাশি বিলাসবহুল পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়ানো যেতে পারে।

এছাড়াও স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নীতিসহায়তার ধারাবাহিকতা, অবকাঠামো খাতের সমন্বিত উন্নয়ন এবং বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে আফ্রিকার বাজারে মনোনিবেশের ওপর তিনি জোরারোপ করেন। এসএমই খাতের উন্নয়নকল্পে ঋণপ্রাপ্তিতে বিদ্যমান নীতিমালার সহজীকরণ, স্বল্পসুদে অর্থায়নের লক্ষ্যে বিকল্প অর্থায়নব্যবস্থার প্রবর্তন ও ডিজিটাল ফাইন্যান্সিং-ব্যবস্থার সম্প্রসারণ অপরিহার্য বলে মতপ্রকাশ করেন তাসকীন আহমেদ। সেই সঙ্গে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং শিল্প খাত ও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য সহনীয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের ওপর তিনি জোরারোপ করেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. আব্দুর রহিম খান বলেন, আমাদের ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে মাত্র ৪০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব আহরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ‘অটোমেশন ও ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো’ সঠিকভাবে কার্যকর না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, লজিস্টিক পলিসি ও বাণিজ্য সহায়তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যয় ১০-১৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। হালকা প্রকৌশল শিল্পকে গেমচেঞ্জার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সহায়তার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গাজীপুরে একটি টেকনোলজি সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং রপ্তানি-নির্ভর বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা না গেলে বিনিয়োগ ব্যবধান হ্রাস পাবে না।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে বিলম্ব ও অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর কারণে বিগত দিনগুলোতে উচ্চমূল্যস্ফীতি পরিলক্ষিত হয়েছে, যদিও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়  থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কারণে ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। রিজার্ভ সংকটের কারণে কাঁচামালের আমদানি ও মেশিনারিজ আমদানিতে বিধিনিষেধের ফলে আমাদের সাপ্লাই চেইনে স্বল্পতা দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এবং চলতি বছরের মধ্যে রিজার্ভ ২৫-২৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলে শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি স্বল্পতা কেটে যাবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) ড. সায়েরা ইউনুস প্রমুখ।