সংখ্যালঘু নির্যাতন অভিযোগের কড়া জবাব বিজিবির

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এবং বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ প্রসঙ্গে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে কড়া জবাব দিয়েছেন বিজিবি মহাপরিচালক। গত বৃহস্পতিবার ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে অভিযোগ করা হয় ভারতের পক্ষ থেকে সেগুলোকে অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।

প্রতিবেদনে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে গত কিছুদিন ধরে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে কথা বলা হচ্ছে সেগুলো অতিরঞ্জিত। আমরা পূজাম-পের (দুর্গাপূজায়) আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা দিয়েছি। সীমান্ত এলাকাগুলোতেও দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’

এছাড়াও ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গত ১৭ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চারদিনের ৫৫তম সীমান্ত সম্মেলনে বিজিবি এবং বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ওই বৈঠকে মোট ছয়টি বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে। উভয় পক্ষ এসব বিষয়ে সম্মত হওয়ার বিষয়টি গত শুক্রবার যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে জানিয়েছে বিজিবি। সম্মেলনে যেসব বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে, সেগুলো হলো :

সীমান্তে যৌথ টহল বাড়ানো : সীমান্তে নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো, হত্যা, আহত বা মারধরের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যৌথ টহল বৃদ্ধি, উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপকৃত হবেÑ এমন তাৎক্ষণিক এবং আগাম গোয়েন্দা তথ্য একে অপরের মধ্যে আদান-প্রদান, সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণের মধ্যে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ, বিভিন্ন ধরনের আর্থসামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ এবং সীমান্তে যেকোনো হত্যার ঘটনায় যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।

স্থাপনা নির্মাণে দুই বাহিনীর যৌথ পরিদর্শন : আলোচনায় সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থাপনা, কাঁটাতারের বেড়া, প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হয় এমন কোনো স্থাপনা বা বাংকার নির্মাণের ক্ষেত্রে উভয় দেশের যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ পরিদর্শক দলের পরিদর্শন এবং যৌথ আলোচনার দলিলের ভিত্তিতে নির্মাণের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বন্ধ থাকা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের ব্যাপারে যথোপযুক্ত পর্যায়ে জয়েন্ট ভেরিফিকেশনের (যৌথ যাচাই) মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা হবে। 

আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আগাম তথ্য আদান-প্রদান : বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন, বিশেষ করে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য ও গবাদিপশু পাচার রোধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানব পাচার, স্বর্ণ, অস্ত্র, জাল মুদ্রার চোরাচালান রোধ এবং এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান করা হবে।

অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি : আন্তর্জাতিক সীমানা আইন লঙ্ঘন করে উভয় দেশের নাগরিক ও বাহিনীর সদস্যদের অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের ফলে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সীমান্তে উভয় বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্তবর্তী জনপদের বাসিন্দাদের অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা থেকে বিরত রাখতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

পাচার হওয়াদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন : মানব পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, বিশেষ করে মানব পাচারের মতো অমানবিক কার্যক্রমে জড়িত উভয় দেশের অপরাধী বা দালাল চক্রের কার্যক্রম প্রতিরোধে পরস্পরকে সহায়তা এবং মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী উদ্ধার ও পুনর্বাসন করা হবে।

পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে পদক্ষেপ : উভয়পক্ষ ‘সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার’ আওতায় পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির জন্য গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে উভয় বাহিনীর পারস্পরিক সহযোগিতার প্রশংসা করে। উভয় পক্ষ আগামী দিনে যৌথ খেলাধুলা, জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনিসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে।

এ ছাড়া আগরতলা থেকে আখাউড়ার দিকে প্রবাহিত সীমান্তবর্তী চারটি খালের বর্জ্যমিশ্রিত পানি অপসারণে উপযুক্ত পানি শোধনাগার স্থাপন, জকিগঞ্জের কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে রহিমপুর খালের মুখ উন্মুক্তকরণ এবং আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান এবং তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিহতের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ এবং সীমান্ত হত্যার ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে বিএসএফ মহাপরিচালকের প্রতি জোর আহ্বান জানান। আঙ্গরপোতা-দহগ্রাম সীমান্তের শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরে সীমান্তে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের বিষয়ে বিজিবি মহাপরিচালক বিএসএফ মহাপরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সীমান্তবর্তী নদীর ভাঙনরোধে তীরবর্তী বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকাজ এবং পূর্বাভাস না দিয়ে বাংলাদেশের উজানে বাঁধ খুলে পানি ছেড়ে দেওয়ায় বাংলাদেশে সৃষ্ট অনাকাক্সিক্ষত বন্যার ব্যাপারে যথাযথ কর্র্তৃপক্ষকে অবগত করার জন্য বিএসএফকে অনুরোধ জানানো হয়।

অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক মানুষের জীবন ও মানবাধিকার চেতনার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রেখে সীমান্তে হত্যা বন্ধে বিএসএফের ‘অ-প্রাণঘাতী’ নীতি অনুসরণের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি মাদক পাচার, চোরাচালান রোধসহ সীমান্তে শান্তির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, এমন যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তে নজরদারি ব্যবস্থা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বিএসএফের মহাপরিচালক দলজিৎ সিং চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়ার জন্য আমরা যথেষ্ট ফোর্স পেয়েছি। একই সঙ্গে আমাদের কাছে প্রযুক্তিগত সমাধানসহ অত্যাধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা আমাদের সিস্টেমের প্রতিটি এলাকার ফিড নিচ্ছি যাতে আমরা সীমান্তে যেকোনো অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি।’